জুবিন ঘোষের কবিতা

চণ্ডালিকামঙ্গল

 

ধুরন্ধর শব , শ্মশানের আঙ্গিনা , বিষ দংশন
তুই নাচছিলি , হাতে মৃত বৃক্ষ , দুরন্ত মাংসল

বুকে তোর পুঁজরক্ত , সারা গায়ে তোর ফোসকা
ঘিলু ভর্তি সাধু-তান্ত্রিক ঘিলু ভর্তি গাঁজা ভদকা

তোর নিচে ছিল মড়া কান্না , তোর নিচে ছিল মধুমন্তি
কেটে গেছে বহু বছরের শোক কেটে গেছে বহু গণ্ডি

তোর দস্যুতা মৃত লোকালয়ে জটাভর্তি নাভিপিণ্ড
আহাঃ বাজছে , ওহে চণ্ডাল নাও ছিঁড়ে নাও হৃদপিণ্ড

শির ছিঁড়ছি ধূম খাণ্ডব ভয়ে কাঁপছে ভূত তল্লাট
প্রেত নৃত্য ঘোর তাণ্ডব বলি প্রস্তুত হে জহ্লাদ

খাঁড়া নামছে বাঁজা রাত্রি ওঁ উন্মাদ পরিমোক্ষ
আজও নাচছে হাতে বৃক্ষ গায়ে কুষ্ঠ পুঁজবক্ষ ।

 

ভৈরব সাধনা ( দশমহাবিদ্যা সিরিজ )

 

ভৈরবী :   আর একটু বাদেই শেষ হয়ে যাবে সমস্ত পুরুষবিদ্যা

থাকবে শুধু ওঙ্কার , আমার ওঙ্কার , নিয়তি ও পিশাচের ।

সেই ধ্বনির মৈথুনে আজ ভৈরব সাধনায় সঁপেছি নিজেকে

মহাশ্মশান , তার মহাশ্মশানে নিয়ে গেছি গণিতাতীত ভাইবোন

হাঁড়িয়া আর সেদ্ধ সর্পে নাল মাখিয়ে প্রেতবিশ্বে, ফের ভাতারখাগী

সন্ধ্যা ঠেলছে ল্যাংটামি বুকে , হাড়মাস ধরে আজন্ম রমণী —

এই পবিত্র দিনটার জন্যই যেন অনন্তকাল কুমারী রেখেছি ওদের ,

কুমারী রেখেছি জিহ্বামূল , আমাদের পরমায়ু , অট্টহাসি , কাকের দৃষ্টিতে

সেই দু’টো দলা মাংসের কাছে আমার দ্বিখণ্ডিত হাত

নতজানু হয়  এই অবিদ্যার কাঁকে–

ভিক্ষা , ভিক্ষা , হে দেবী ,  শুধু ঋণ দাও বস্ত্র , বলে নগ্ন , হে নগ্ন দেবীতে-আমাতে

জ্বলতে পুড়তে মরতে চলেছি আগুনের তলায় তলায়…

 

ছিন্নমস্তা ( দশমহাবিদ্যা  সিরিজ )

 

ছিন্নমস্তা : তার হিংস্রতার পরিমাণ আদ্যার মতো

এমন কী নিজের রক্ত নিজেই খেতে পারে যে

তাকে কিভাবে বিশ্বাস-অবিশ্বাস করা যায়, বলো ?

সেই মতো-তো সড়গড় নই দেবী, এই রূপ-তো সড়গড় নয়

সেই জানে ভক্তি ও ভয় । তুমি দেবী জীবিত না মৃত

ঠোঁটে তোর গরল না অমৃত , তা কি জয় না পরাজয়ের ?

সব শোণিত শেষ হয়ে গেলে , একান্তে নিরালায় পেলে

কোনও দিন-না দেবী , তুমি আমাকেই খেয়ে ফেলো… !

 

ষোড়শী  ( দশমহাবিদ্যা  সিরিজ )

 

ষোড়শী :  আমার প্রাতিটি রক্ত মাটিতে পড়ে বীজ বপণ করে
প্রতিটি বীজে আমার পুনঃজন্ম হয়, যেন আমি,
কোনও মৃতুই তার ভালবাসা থেকে আমায় গ্রাস করতে পারে না
সেই ‘আমি’-কে বধ করতেই এগিয়ে আসেন মেয়েটি—ভালবাসার দ্বীপিচর্ম পরিহিতা…

 

খাদক

 

কাকের মতো হয়ে যাচ্ছি  আমি

কাকের  মতো সুরে

হা ফুরফুরে , উফঃ ! হা ফুরফুরে …

বাঁশির মতো ফেনিয়ে উঠছে ভেতরটা

অনেকটা বাঁশির জিঘাংশা জুড়ে

তুমি আর আমি আবর্জনা

হা ফুরফুরে দেবলীনা

হা ফুরফুরে…।

 

কালো বেড়াল ( ভুতগ্রস্ত সিরিজ )

 

থাবা দ্যাখা , ধারালো নখর

চোখের নিচে ঠাণ্ডা চাঁদ

গড়িয়ে নামে

ভরিয়ে নামে

এখন আমি ডিপথিরিয়া

ওগো , তুমিই আমার কালো বেড়াল

ওগো , তুমিই আমার বিষ্ণুপ্রিয়া ।

ঘটনা ক্রমশ পাল্টাচ্ছে বলে

ঘটনা ক্রমশ পাল্টাচ্ছে বলে

তোমাকে আর আদর করতে পারি না

মিটিং , মিছিল , সমাবেশ

আশঙ্কিত একটা ইস্তেহার , ভয়ে যেন

চোখ খুলতে পারি না , গা ঢাকা দিয়ে আছি

শহরে ; কেউ যদি উচ্ছিষ্ট হাত দুটো দেখে ফেলে

জানালা দিয়ে শুনতে পায় শীৎকার

আবার যদি টেনে নিয়ে যায় ওদের মাঝে

তুলতে বলে পতাকা –

না – না সোনা ,

জ্বলন্ত টায়ারের চাঁদে

আরও একটা বাস পোড়াতে আর সত্যি পারি না

 

ঘটনা ক্রমশ পাল্টাচ্ছে বলে

 

নিজেকে আর পোড়াতে পারি না

ঘটনা ক্রমশ পাল্টাচ্ছে বলে

এখন আর আমি আদর খেতে পারি না…

 

ঘাতক

 

চন্দ্রাহত ঘাতক খুঁজে বেড়ায় অশরীরী গন্ধ

ঊর্ধ্বে জ্বলন্ত ন্যাড়া মুণ্ড , নিম্নে পচনশীল রন্ধ্র

সব রন্ধ্রই বিঁধে যায় পৃথিবীর শেষ গর্তে

খুব্লে নেবে একখণ্ড ধূর্ত তির

যে তীর তিস্তা পারে তির তির করে করে বয়

খুন করব নিজেকে আমি , যদি খুন করতেই হয় ।

 

দেবলীনার সঙ্গে একদিন

 

একটু স্থির হয়ে বসো দেবলীনা । দেখি তোমায় , এই সময়

এতদিন পরে , আজও চেনা গন্ধ কোথাও

লেগে আছে কি না ?

ছিলে কোথায় এতকাল ? দুই কূল দুই পার

ভেঙ্গে গেছে চেনা নদী , বাঁশবন , অন্ধকার

দলায় পাকানো চিঠি , মিনিস্কাট , ব্ল্যাকবোর্ড দিদিমণি

এসব পুরোনো কথা , সুপর্ণা তন্তুপরী , ইদানীং নিস্তারিণী

মন্দির ঢুকতে আমি লবণ ফেরি করি ।

সবাই মিলে দলবলে ছাত্রী ব্রজবালা

একা ছিল বড় একা সিদ্ধেশ্বরী তলা

স্কুল পার হয়ে পথ চৌরঙ্গি মোড়ে

দু’ মুঠো আকাশ হাঁটে একমুঠো ধরে

মনে আছে দেবলীনা ? – এইখানে থাকি

পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্ম , কোচিং ক্লাসে ফাঁকি

অপূর্ব সে মধুমাস অপূর্ব সে ভুল

টলোমলো পায়ে পায়ে ব্রজবালা স্কুল

দশবেলা ছুটে যাই একবেলা দেখা

আজও সেই পথ হাঁটি তবে একা একা…

কে আছে সঙ্গে তোর ? একি তোর বর , একি তোর স্বামী !

আহা , ভাল দেখতে বড় , দু’ চোখ বাদামি

পুড়ে যাচ্ছে বুক আমার , ধুলো জমা শরীর

ফিরে এস ছেলেবেলা , ভাঙ্গা হাত ঘড়ি

একটু স্থির হয়ে বসো দেবলীনা । দেখি তোমায় , এই সময়

বিকেলের রোদে । সুখে রেখো ঠাকুর ওকে ,

ভালো রেখো ওদের ।

সুখে রেখো ঠাকুর ওকে , ভালো রেখো ওদের …

 

কুণ্ডলিণী জাগরণ ( দশমহাবিদ্যা  সিরিজ )

 

কালীকাঃ

জঙ্ঘায় লাগে ক্ষেতফসল জঙ্ঘায় লাগে পাপ

পায়ের নিচে বয়ে যাচ্ছে মাংসল অভিশাপ

মাথার উপরে গনগনে চাঁদ , স্কন্ধে নরমুণ্ড

খর্পরদেশে পুড়িয়ে ফিরছি যোগ-যোগিনী কুণ্ড

অপুর্ব সে   রক্তস্বাদ  জন্মঋণী  ভিন্ন  ক্লীব

প্রেমের উপর উপর উগড়ে দিলাম

.                             দুর্ধর্ষ শীর্ণ জিভ…

Comments
3 Responses to “জুবিন ঘোষের কবিতা”
  1. কেয়া says:

    কবিতাগুলো অন্যরকম ।

  2. khadok ar ghatok ei duto bhaloi laglo:)

  3. aparajita1971 says:

    হা ফুরফুরে দেবলীনা

    হা ফুরফুরে…।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: