বীরেন মুখার্জীর প্রবন্ধ

বিভূতিভূষণের ছোটগল্পে জীবনবোধ

 

‘লেখকমাত্রই মেধাবী’ কথাটি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে সাহিত্য বোদ্ধামহলে। তবে একজন লেখক যে প্রখর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন হবেন তা নিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। একজন বড় সাহিত্যিকের ‘টোটাল’ পরিচয় নিহিত থাকে তার সাহিত্যকর্মের ব্যাপ্তি ও বহুমুখীনতায়। বহুবিধ সংযোগ ও লিখন প্রতিভার গুণে একজন সৎ সাহিত্যিক নিজের জন্য পাঠক-বোদ্ধামহলে স্থায়ী আসন করে নিতে সম। এ ক্ষেত্রে লেখক তার চারিত অভিজ্ঞানের বিস্তৃতি ঘটান তার সৃষ্টিকর্মে। সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবেশ, প্রতিবেশ, অর্থনীতি থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি স্তরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াবলী তাকে পরিমার্জিত শৈলীতে উপস্থাপন করতে হয় তার সাহিত্যে। যাপনের এমন কোনো বিষয়-আশয় নেই যা একজন সাহিত্যিক স্পর্শ করতে অম। যে কারণে সৎ সাহিত্যিকের হাতে রচিত সাহিত্যকর্ম যুগ যুগ ধরে পাঠক তার অন্তঃস্থলে ধরে রাখে। অনেক সময় দেখা যায়, আপাতসরল দৃষ্টিতে সমাজ সম্পর্কে উদাসীন সাহিত্যিকের রচনাতেও গভীরভাবে উঠে আসে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার অনুপুঙ্খ বাস্তবতা। এক্ষেত্রে সাহিত্যিক অনেকটা অজ্ঞাতসারেই তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সম হন। এরূপ রচনা পাঠে আলোচকরা প্রথমদিকে রচনাটির শিল্পমূল্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও সেটির নিবিড় পাঠ ও পর্যালোচনায় আবিস্কৃত হয় অপরিমেয় শিল্পমূল্য এবং সমাজ মূল্য। এ ধরণের সাহিত্য পাঠে সাহিত্যিকের এক ধরণের নিরীক্ষাপ্রবণ মানসিকতার সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটে। উন্মেষ ঘটে লেখকের শ্রেণীসচেতনতার। লিখনীতে মানব-সংসারের বিচিত্রতা তেমনভাবে ফুটে ওঠেনি এমন অভিঘাতে জর্জরিত হতে হয় ‘পথের পাঁচালী’র অমর রূপকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাহলে প্রশ্ন জাগে- বিভূতিভূষণ কি শ্রেণীচেতন ছিলেন না? মানুষের জীবন-যাপনের প্রতিমুহূর্তের বিবর্তিত অবস্থা, সংঘাত জানতেন না তিনি? প্রকৃতার্থে বিভূতিভূষণ রচিত উপন্যাস কিংবা ছোটগল্পের চরিত্র স্থান, কাল, পাত্র সমন্বয়িত হতে দেখা যায় সুষম বিন্যাসে। উপন্যাসিক হিসাবে বিভূতিভূষণের খ্যাতি বেশি হলেও তার গল্পগুলোতে আবেগঘন পরিস্থিতির প্রাধান্য থাকায় সমকালীন অনেক সমালোচক তার ব্যাপারে ঔদাসীন্য দেখিয়েছেন। সমাজতন্ত্রবাদী লেখক ও সমালোচকরাও তাকে  এড়িয়ে গেছেন। অথচ তার ‘মেঘ মল্লার’ (১৯৩১), ‘মৌরীফুল’ (১৯৩২), ‘জন্ম ও মৃত্যু’ (১৯৩৮), ‘নবাগত’ (১৯৪৪) গ্রন্থের গল্পগুলো শ্রেণীচেতন বিভায় সমুজ্বল। বিভূতিভূষণের রচনাতে একদিকে যেমন ফুটে ওঠে শ্রেণী-বৈষম্য তেমনি রয়েছে নর-নারীর শ্বাশত রোমান্টিকতা। রয়েছে প্রকৃতি অবলোকনের অপূর্ব দর্শন। ইউরোপ-আমেরিকার নবজীবন-চেতনার প্রবাহ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে সামাজিক ও নৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রবল হাওয়ায় তৎকালীন ভারতের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নাগরিক জীবনের আলোড়ন, আক্ষেপ, হতাশা নানামুখী বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার রচনাশৈলীতে স্পষ্টভাবেই মুদ্রিত। বিভূতিভূষণের ছোটগল্পে ইদ্রিয়বেদী অনুভূতিগুলি প্রযত্ন পরিচর্যায় বেড়ে উঠতে দেখা যায়। দৃশ্য, ঘ্রাণ, শ্র“তি, স্বাদ অনুভবভেদ্য প্রায় প্রতিটি উপযোগই তার লিখনীতে সঘন। এরপরও তৎকালীন প্রগতিবাদী সমালোচকরা তার প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। মূলত ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’ প্রকাশিত ‘প্রগতি’ পত্রিকায় বিভূতিভূষণের ‘সই’ গল্পটি প্রকাশিত হলে তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ ওঠে। কারণ হিসাবে বলা হয়, প্রগতি ছিল ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন-আন্দোলনের প্রতিরোধী মঞ্চ। সেখানে বিভূতিভূষণের লেখায় কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ বিরোধী ভূমিকা দেখা যায়নি। ‘সই’ গল্পটি লেখা হয়েছিল গ্রামীণ শৈশবে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের দু’টি মেয়ের বন্ধুত্বকে উপজীব্য করে। কালপরিক্রমণে বড় হবার পর দুই বান্ধবীর মধ্যে মধ্যবিত্ত মেয়েটি পায় সচ্ছল সংসার এবং দরিদ্র মেয়েটির ভাগ্যে জোটে কপর্দকহীন-সঞ্চয়হীন জীবন। একদিন সেই দরিদ্র মেয়েটি তার শীর্ণকায় শিশু পুত্রটিকে নিয়ে সইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে। তার মনে আশা ছিল শৈশবের সই তার শিশু পুত্রটিকে দেখে হয়তো তাকে একটা মিষ্টি এনে দিবে কিংবা দুপুরে না খেয়ে ফিরতে দিবে না। কিন্তু তেমন কোনো ঘটনা ওই মেয়েটির ভাগ্যে ঘটে না। শিশুটির ভাগ্যে জোটে জলের সঙ্গে একটু গুড়; অথচ তার ছেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এলে মধ্যবিত্ত সইটি তার নিজের ছেলেকে ভাত খাইয়ে নিজে গিয়ে শুয়ে পড়ে। সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের ফলে শৈশবের স্বাভাবিক সম্পর্কটি এ গল্পে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। বিবর্তনের ধারায় সম্পর্কটি হয়ে উঠেছে অনুগ্রহদাত্রী আর অনুগ্রহ প্রার্থিনীর মধ্যেকার সম্পর্ক। গল্পটিতে মধ্যবিত্তের এই আচরণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও উদাসীনতা যে হৃদয়হীনতার নিদর্শন হয়ে দাঁড়ায় সে বিষয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়; যা আমরা ভুলে যাই। মানুষের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও যে শ্রেণীগত পার্থক্যের বোধ গভীরভাবে নিহিত থাকে সেটিই লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন আশ্চর্য সমতায়।

‘কয়লাভাটা’ গল্পটিতে গল্প-কথক ‘আমি’ চরিত্রটি অংশীদারীর ভিত্তিতে কয়লাভাটার ঠিকাদারী নিয়েছিল। কিন্তু কুলি-মজুরদের কম মজুরি দেয়া হয় এজন্য তিনি ঝুড়ি প্রতি রেট প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়। দেখা যায় হাতে পয়সা বেশি পেয়ে মজুররা নেশা করে পড়ে থাকে। ফলে রেট আবার কমিয়ে পূর্বের মত করা হয়। রেট বাড়লে তার মুনাফা কমে যাবে এটা জেনেও তিনি সেটা করেন। জানা যায় এটা তার অপর অংশীদারের কারসাজি। সে-ই কুলিদের নেশা করার টাকা দিয়েছিল। পূর্বের রেটে ফিরে গিয়ে কুলিরা সেই ‘আমি’ চরিত্রটি ঠকে গেছে বলে কৌতুক অনুভব করে। এ গল্পটিতেও সাম্যবাদের ছোঁয়া পাননি প্রগতিবাদীরা। গল্পটি মামুলি হলেও শিল্পী বিভূতিভূষণ সর্বহারা শ্রেণীর চেতনার জাগরণে সক্রিয় ছিলেন বলে ধরা পড়ে। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন বঞ্চিত শ্রেণী অনেক সময় নিজেদের অধিকার আদায়েও সচেতন নয়। যুগে যুগে পুঁজিবাদীরা তাদের স্বার্থ রক্ষায় সর্বহারাদের ঠকাতে নানা কৌশল অবলম্বন করে, গল্পটিতে তারই বাস্তবতা বিবৃত হয়েছে। প্রশ্ন জাগে গল্পটি কি শ্রেণী চেতনতা সমর্থন করে না?

বিভূতিভূষণের কাছে কোনো নীতি, তত্ত্ব বা মূল্যবোধের কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থ ছিল না, যদি না সেসব নীতি, তত্ত্ব বা মূল্যবোধ মানুষকে আশ্রয় দিতে না পারে। সুতরাং এ কথা বলা মোটেও অসঙ্গত নয় যে, গ্রামীণ জীবনের নীতিবোধ ও মূল্যবোধের রক্ষণশীলতা বিভূতভূষণ সমর্থন করেননি। তিনি শ্রেণী বিদ্বেষীও নন কিংবা ব্যক্তিগতভাবেও কাউকে ঘৃণার চোখে দেখেননি। যে কারণে তার অধিকাংশ ছোটগল্পই গ্রামীণ জীবনের শান্তি ও পারস্পরিক নিশ্চিন্ততা নিয়ে বেড়ে ওঠে। তিনি নিজে বলেছেন, ‘সাহিত্য আমাদের কল্পনা ও অনুভব-বৃত্তিকে উজ্জীবিত করে।… কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী যত কথা বলেন, তার মর্ম এই যে আমাদের ধরণী ভারী সুন্দর- একে বিচিত্র বললেই বা এর কতটুকু বোঝান হলো! আমাদের এ দৃষ্টিটি বারে বারে ঝাপসা হয়ে আসে, প্রকৃতির বাইরেকার কাঠামোটাকে দেখে আমরা বারে বারে তাকে ‘রিয়ালিটি’ বলে ভুল করি, জীবন-নদীতে অন্ধ গতানুগতিকতার শেওলাদাম জমে, তখন আর স্রোত চলে না; তাই তো কবিকে, রসস্রষ্টাকে আমাদের বারবার দরকারÑ শুকনো মিথ্যা-বাস্তবের পাঁক থেকে আমাদের উদ্ধার করতে।’

বিভূতিভূষণের সমকালীন অনেক লেখকই বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞান নিয়ে যন্ত্রণাময় কাহিনী রচনা করছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম ধারার সাহিত্যকর্মী। বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি যখন পৃথিবীর নানান মতবাদ আর পরিবর্তনের দোলায় দুলছিল, ঠিক সেই সময়ে ঝাঁঝালো জীবনবোধের বেড়াজাল থেকে মানুষকে অনাড়ম্বর ঘরোয়া পরিবেশে টেনে আনতেই তিনি নিরলস শ্রম বিনিয়োগ করেছেন। ফলে চিরায়ত গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সংরাগ আর দ্বান্দ্বিক সৌন্দর্য ও রসবোধকে সহজেই তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেন। দেহজীবিনীদের নিয়ে রচিত ‘হিঙের কচুরি’ গল্পটি বিভূতিভূষণের বহুল পঠিত গল্পের একটি। শৈশবে নন্দরাম সেনের গলিতে মাখন-কুসুম-প্রভাদের ঘরে নিয়মিত যাতায়াত ছিলো গল্প কথকের। প্রাপ্ত বয়সে তার প্রতি সবচেয়ে বেশি স্নেহ পরায়ণ কুসুম এখন একটি মেসের পরিচারিকা। অথচ কুসুম তার বিগত পতিতা জীবনের জন্য কোনো ধরণের সঙ্কোচ বোধ করে না সেই আট বছরের ছেলেটিকে বন্ধু বেষ্টিত দেখে। কখনও গোপন করার চেষ্টা করেনি নিজের পরিচয়। উপরন্তু পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে কুসুম সেই কচুরি-লুব্ধ বালকটিকে হিঙের কচুরি এনে খাইয়ে তৃপ্ত বোধ করে। তার ‘বিপদ’ গল্পটিতেও বর্ণিত হয়েছে জীবন-জীবিকার কারণে পতিতার খাতায় নাম লেখানো একজন গ্রাম্য বালিকা হাজুর কথা। একদিন যে মেয়েটি ভিখারিণীর মতো অন্ন-বস্ত্রের চাহিদা মিটিয়েছে সে এখন নিজের ঘরে বসে গ্রামের চেনা লোকদের আত্মীয়জ্ঞানে আপ্যায়ন করে। অথচ ওই বালিকার পিতাও কোনোদিন শহরে বসবাস কিংবা কাপ-পিরিচে চা খাওয়ার কথা কল্পনা করতে পারেনি। গল্প-কথক তার গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় হাজু তাকে ঘরে ডেকে এনে সোপার্জিত অর্থে চা খাওয়ায়। এ সময় তার চোখে মুখে পরম সাফল্য ফুটে ওঠে।   

বোধকরি জীবনের মূলধারাকেই বিভূতিভূষন তার রচনাকর্মের আধার হিসাবে বিবেচনা করেছেন। যে কারণে বিশ্বব্যাপী কার্ল মার্কসের বৈপ্লবিক সাম্যনীতি গ্রহণ-বর্জনের দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েও নগরকে পাশ কাটিয়ে গ্রামকেই সাহিত্য চর্চার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করেন। চরিত্র সৃষ্টিতে প্রাধান্য পায় গ্রামের খেটে খাওয়া, অবহেলিত সাধারণ মানুষ। কাহিনীতে ফুটে ওঠে আমাদের চেনা-জানা মানুষের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহ। প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের জীবনাচরণের সজীব ও নিখুঁত চিত্র তার কথাশিল্পে পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিক ডামাডোলে বিভূতিভূষণের সৃষ্টিকর্মের মৌলিকত্ব সমকালীন আলোচকদের কাছে প্রশ্নশীল হলেও তার প্রখর জীবনবোধ ও শিল্পবোধ জারিত রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের এক অনবদ্য স্বর্ণফসল। উত্তরকালে তার রচনার পাঠকপ্রিয়তা এটাই প্রমাণ করে যে, দূরাশ্রয়ী অন্তর্দৃষ্টির মিশেলে রচিত উপন্যাসের পাশাপাশি বিভূতিভূষণের ছোটগল্পগুলোও পাঠককে মহাকালাশ্রয়ী চৈতন্যে টেনে নিতে সক্ষম। আর এখানেই সৃষ্টির প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: