জাহেদ সরওয়ার এর প্রবন্ধ : কবিতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জোসেফ ব্রদস্কি কেন গুরুত্বপূর্ণ

জোসেফ ব্রদস্কি কবি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ কিনা অথবা তিনি নোবেল প্রাইজ পাওয়ার যোগ্য কিনা এই বাজে প্রশ্নের ভেতরই আটকে আছে বছরের পর বছর ব্রদস্কি বিষয়ক আলোচনা। ফলে সোভিয়েত ভাবাপন্ন হৃদয় থেকেও তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার মতই নির্বাসিত। কারণ জগতে এত কবিতা যে কালের গর্ভে বিলীন হচ্ছে সেখানে একজন ব্রদস্কির বিতর্কিত কবিতার কি এমন গুরুত্ব! কিন্তু অদ্ভুত ভাবে কবিতার ইতিহাসে দেখা গেছে একজন কবির জীবন যতক্ষণ পর্যন্ত না কবিতা হয়ে ওঠে ততক্ষণ তার কবিতা গ্রহণ করেনা কাল। সেই হিসাবে ব্রদস্কির শুরুটাই হয়েছিল একটা সিদ্ধান্ত দিয়ে যে ব্রদস্কির জীবন ও কবিতা অভিন্ন। কবি বা কবিতার সাথে তথাকথিত আদর্শ রাষ্ট্রের বিরোধ প্রায় চিন্তার সমবয়সী। কারণ কবি নিজে সার্বভৌম, ইশ্বরের মতই। ফলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কাছে সহজেই সে আক্রমণের লক্ষ্য। কারণ রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থার মাথাব্যথা। এ কারণেই সেই প্লাতনীয় সক্রাতাসের ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে কবিকে তাদের আদর্শ রাষ্ট্র থেকে নির্বাসিত করেন। এই কারণেই নাজিম হেকমতকে নিক্ষেপ করা হয় মলের ভাণ্ডে। নেরুদাকে  মেনে নিতে হয় গৃহবন্দিত্ব। শুধু ব্রদস্কি নয়, সোভিয়েত রাশিয়া থেকে নির্বাসিত হন ইভান বুনিন, সলোঝিনিৎসিন, আনা আখমাতোভাসহ আরো অনেকে। এরকম শত উদাহরণে প্রোজ্জ্বল কবিতার ইতিহাস।কারণ ইশ্বর যেন ভুল করে একটা চোখ উপহার দিয়েছিল কবিকে। কেন দিয়েছিল তা কবি জানেনা। এমনকি কবি ইশ্বরের একনায়কতন্ত্রও পছন্দ করেনা। 

ব্রদস্কি তাঁর প্রবন্ধ ‘ লেস দ্যান ওয়ান’ এ লিখেছেন  কৈশোরের আগেই লেনিন সম্পর্কে তার মনোভাব ছিল বিরূপ। এর কারণ ‘তাঁর রাজনৈতিক দর্শন অথবা চর্চার জন্য নয় কারণ সাত বছর বয়সে আমি ঐসব বিষয় সম্পর্কে কিছুই বুঝতাম না, বরং পাঠ্যবইয়ে, প্রতিটি ক্লাসের দেওয়ালে, স্ট্যাম্পে, টাকায় এবং প্রায় সবকিছুতেই লেনিনকে যেভাবে সর্বশক্তিমান হিসাবে তুলে ধরা হতো , যে আমার তাঁর প্রতি মনোভাব ক্রমশ বিরূপ হয়ে যায়।শাসন ব্যবস্থা একটা সিস্টেম। হয়তো একটা সিস্টেমের  মধ্যে দিয়ে না গেলে তা স্থায়ীত্বও পায় না। ফলে জনস্রোতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখা যায় সৃজনশীলতা বিশেষ করে কবিতাকে কোনো সিস্টেমে আটকে রাখা যায় না। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবনই আলাদা রাজ্য। আর কবিদের জীবন নৈরাজ্য। রাষ্ট্র যে সব সিস্টেমের ভেতর দিয়ে সফল হয়ে ওঠে তা প্রায়ই অমানবিক। সভ্যতার ইতিহাসে মানবিক রাষ্ট্র বিরল। রাজ্য যারা শাসন করে তারাও ব্যক্তি। তারা সমষ্টির মুখোশ পরে থাকে কেবল। সমষ্টির ব্যানারে ব্যক্তির পায়ুবাসনা। এই গণমানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে  সুস্থ সমাজব্যবস্থার স্বপ্নের চেয়েও গভীরে ও দূরে কবি হৃদয়ের যাত্রা। ফলে রাষ্ট্র, সমাজ বাস্তবতার কাছে কবি চরিত্র দুর্বোধ্য কিছু। জনসাধারণের কাছে রাগসঙ্গীতের মতো। আর যখন কবির লেখায় ফুটে উঠে ক্ষমতাসীনদের দাম্ভিক হাস্যকরতা। তখন সেই দুর্বোধ্যতা রূপ নেয় শত্রুতায়। তখন রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে সেই ব্যাক্তিরা  কবিকে হত্যা করার জন্য নিদেন পক্ষে কলম স্তব্ধ করে দেবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। সবে লেখা শুরু করেছেন তখন ব্রদস্কি। নিজের লেখার চাইতেও বেশি অনুবাদ করছেন বিভিন্ন ভাষার কবিদের। নিজের গরজেই শিখেছিলেন বহুভাষা। ইহুদির সন্তান বলে সাবমেরিন একাদেমিতে ভর্তি হতে না পারা ব্রদস্কি কবিতা লিখতে শুরু করেন ১৯৫০ এর শেষের দিক থেকে। বিভিন্ন ভাষা  থেকে তিনি অনুবাদ করেন চেশোয়াভ মিউশ, ডান, মারবেলের কবিতা। কাফকা, প্রুস্ত,  ফকনারের গদ্য।ব্রদস্কি কবিতা লেখার পাশাপাশি নানান ধরণের কাজ করতে থাকেন। 

কবিতা লেখার জন্য পেশা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কবি যে কোনো পেশার হতে পারেন বা এটা এভাবে বলা যায় যে কোনো পেশার লোকই কবিতা  লেখা শুরু করতে পারে। আর এই নানামুখি কর্ম ততপরতার কারণেইতো কবিতা বিচিত্রগামী হয়ে ওঠে। ব্রদস্কি বুঝেছিলেন কবিতা রাজনীতির চাইতে বেশি কিছু। তিনি প্রাথমিকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন মেটাফিজিক্যাল কবিদের দ্বারা। তার কবিতা সামিজডাট সংস্করণগুলোতে প্রকাশিত হতে থাকে ও বিচিত্রগামী কবিতা হিসাবে পাঠক আদৃত হতে থাকে। সোভিয়েতে তখন কবিতার বন্ধ্যাত্ব প্রায় চরমে। গঠনমূলক ইন্ডাস্ট্রিয়াল রাষ্ট্রীয় কবিতার যুগ। যতই স্বতন্ত্র কবি ও স্বাধীন চিন্তক হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে ব্রদস্কির ততই তিনি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দাদের নজরে আসতে থাকেন। ‘সামাজিক পরজীবী’ নামের হাস্যকর অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ব্রদস্কির গ্রেপ্তার ও তার বিচারপ্রহসন ও বিচারকের সাথে তার সংলাপ বিনিময় মনে করাতে পারে প্লাতনীয় সক্রাতেসের সংলাপকেই। কবিতার ইতিহাসে এই সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ কবিতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে। প্রমাণিত হলো কবিতা আসলে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব মানে না, মানতে পারে না। কারণ একজন কবি তার নিজস্ব সার্বভৌমত্বের অধিকারি, তিনি তার রাজ্যপ্রধান। এখানেই রাষ্ট্রের সাথে তার শত্রুতা। 

রাষ্ট্র কাঠগড়ায় ব্রদস্কির কাছে জানতে চায় ‘ আপনার পেশা কি?’ তিনি বলেন ‘কবিতা’

হয়তো তার এই সাহসই নিজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে আরো বেশি লেলিয়ে দেয় পরবর্তী প্রশ্নের জন্য।

‘কবিতা বিষয়ে আপনি  কোন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিয়েছেন।’ রাষ্ট্র বলে।

ব্রদস্কির বলেন ‘কোনো বিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকে কবিতা আসে বলে আমি মনে করি না।’

রাষ্ট্র তার জাল আরো প্রসারিত করবার সুযোগ পায় ‘ তাহলে কবিতা কোথা থেকে আসে?’

এর জবাবে ব্রদস্কি বলেন ‘মনে হয় ইশ্বরের কাছ থেকে।’

এই বাক্যটাই নির্মাণ করে ব্রদস্কিও ভবিষ্যৎ। ব্রদস্কি এই বাক্যটির মাধ্যমে বিরোধীতা করেন  শুধু রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে ব্যক্তির নয়। একটা সিস্টেমের, বস্তুবাদের। নিজে নাস্তিক হলেও তিনি একটা সিম্বল হিসাবে বাক্যটিকে প্রয়োগ করেন। ততক্ষণে বিচারকও জেনে গেছে কি আছে ব্রদস্কিও কপালে। তবুও অবিচল ধৈর্য্য ধরে বিচারক তাকে আবার প্রশ্ন করে।

‘কারা কবি হিসাবে আপনার স্বীকৃতি দিয়েছে?’

তৎকালীন সাংবাদিক ফ্রিদা ভিগদোরোভার বরাদ দিয়ে বলা যায় ব্রদস্কিও উত্তর ছিল এরকম।

‘ কেউ না (অত্যন্ত নিরাসক্তভাবে)। তিনি উল্টা প্রশ্ন করেন‘ কে আমাকে এই মানবজাতির ভেতর অন্তর্ভূক্ত করেছে?’

এরপর ব্রদস্কিকে পাঠানো হয় পাগলা গারদে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিখ্যাত জেলখানা ক্রেস্টিতে। জেলে তিনি নথিভুক্ত ছিলেন ‘ লেস দ্যান ওয়ান’ ক্যাটাগরিতে। পরে লেস দ্যান ওয়ানই হয়ে উঠেছিল তার প্রবন্ধ সংকলনের নাম।  ব্রদস্কিকে কঠিন পরিশ্রমসহ পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়।নড়ে চড়ে উঠে পৃথিবীর কবিরা। জা-পল সার্ত্র  ও আন্না আখমাতোভার নেতৃত্বে গড়ে উঠা প্রতিবাদের ভিত্তিতে সাজা মকুব করা হয়। এর পর ব্রদস্কিকে বাধ্য করা হয় নির্বাসনে।  পোয়াতি ইলিশ মাছ ও স্যামন মাছের সাথে কবিদের অদ্ভুত মিল বারবার আলোচিত হয়ে আসছে। এই মাছদ্বয় তাদের সন্তান প্রসবের সময় অপেক্ষাকৃত কম ঢেউয়ের নদীর দিকে চলে আসে। হয়তো সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবেই। কবিকেওতো বুকে কবিতার সৃষ্টির ডিম নিয়ে পেরোতে হয় কত উজান, জোয়ার। সত্যিকার অর্থে পলায়নবাদিতা কবিদের জন্য দোষের কিছু না। কারণ তিনি পল্টনের যোদ্ধা নন গেরিলা যোদ্ধা। তার আক্রমণ চোরাগুপ্তা। যাইহোক উপরোক্ত সংলাপ একজন কবির সাথে একটা রাষ্ট্রের সংলাপ থেকে বেরিয়ে আসে অনেক কিছু। 

চিরতরে তাকে ফেলে যেতে হয় প্রিয়তমা স্ত্রী ও সন্তানকে, মাতৃভুমি ও মাতৃভাষাকে। সেই ক্ষরণকে কাজে লাগান তিনি কবিতায়:

আর বাতিটা জ্বলে উঠার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি

ওখানে তোমাকে ফেলে নি:সঙ্গ ফেলে এসেছি

আধাঁরে, স্বপ্নের ভেতর, যেখানে শান্তভাবে তুমি

প্রতীক্ষা  করতে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত। (ইন লভ)

অথবা

বেড়ে ওঠো, টেলিম্যাচাস, আত্মজ আমার

ইশ্বর জানেন আর কখনো দেখা হবে কিনা

হয়তো এখন তুমি সেই শিশুটি নেই

একদিন যার সামনে আমি লাঙল- দেওয়া বলদটার কাঁধে জোয়াল চাপিয়েছিলাম (টু টেলিমেচাস ফ্রম অদিসিয়াস)

এভাবে চিরনির্বাসিত এক কবি। তার কবিতায় একাকার করতে থাকেন তার যাবতীয় স্মৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্য। স্তালিনের রাশিয়া গ্রহণ করতে পারে নি পাস্তারনাকের উপন্যাস, আখমাতোভার কবিতা, বুনিনের গদ্য তারা যে ব্রদস্কিকে গ্রহণ করবেন তা আশা করা যায় না। ১৯৫৬ সালে ২০ তম পার্টি কংগ্রেসে নিকিতা ক্রুশ্চেভ তার বক্তব্যে শিল্পপ্রশ্নে উদারতার প্রসঙ্গ তুললে ও সোভিয়েত রাশিয়ার চিন্তার জগতে অন্যভাবনার হাওয়া বইতে থাকে। কিন্তু পরে ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে অবদমিত করে রাখার রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়াতে পারেন নাই। আখমাতোভা, পাস্তারনাক, ব্রদস্কি তাদের লেখার ভেতর যে আধ্যাত্বিকতার জগতে ব্যক্তির অবস্থানকে খুঁজে বেড়ায় তা স্বভাবতই বস্তুবাদবিরোধী। সমাজতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো সবচাইতে দমিয়ে রাখতে চায় চিন্তার স্বাধীনতা। ব্রদস্কির নির্বাসন এর বাইরে নয়। 

কিন্তু কবিতা রাজ্য সাম্রাজ্য শাসনতান্ত্রিক অবকাঠামো ছেড়ে কোথায় যেন যেতে চায়, সবকিছু ছেড়ে। হয়তো যেখানে সময় ও স্থান এসে মিলেছে। এই অনুসন্ধানইতো কবির সাধনা। এই ক্ষতবিক্ষত কাটা বিছানো রাস্তাইতো তার রাজ্যে পৌছানোর একমাত্র পথ। ব্রদস্কিকে আরো অনেক দিন মনে রাখবে কবিতার ইতিহাস কবিতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে।

Comments
One Response to “জাহেদ সরওয়ার এর প্রবন্ধ : কবিতার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে জোসেফ ব্রদস্কি কেন গুরুত্বপূর্ণ”
  1. shuvroneel says:

    khub valo laglo lekhati.
    lekhoker jonyo shuvo kamona…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: