ফাতেমা সুলতানা শুভ্রার গল্প : মহুয়া, প্রকাশক এবং একটি ট্রেন ভ্রমন

 

১ 

“এই গল্পের একটা পটভূমি আছে”…

চরম বিরক্তি নিয়ে আমি আমার পুরান প্রেমিকের পৌরাণিক বাচাল বাস্তবতা হজম করছি। সুস্বাদু খাবার মুখে চাকবার মতো লালা টেনে সে আবার ভীষণ আনন্দে বলতে শুরু করলো “একটা কিসিম, বুঝছো না! শে আমাকে দেইখাই সইরা গেলো। আমি তো টাসকি খায়ে গেলাম”। প্রকাশক হিসেবে আমার এই পুরান প্রেমিক এখন একটু নামডাক করেছে। আমি আবার ইদানিং একটু আধটু লিখি। তারসাথে একটা পিচ্ছিল সম্পর্ক বানায়ে বই ছাপানোর কাজটা আমি মনে হয় মুফতেই করতে চাই। আমি এক্কেবারে ঘোলা মগজ নিয়ে তার দিকে সিরিয়াস ভঙ্গি করে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ খেয়াল হলো প্রবল উত্তেজনায় আমি আমার বাঁ পাশের পা ঠকঠক করে কাঁপাচ্ছি। সেকারণে তার আর্টিস্টিক খাবার টেবিলের উপরে সাজিয়ে রাখা কাঁচের লম্বা সরু সরু গ্লাসগুলো টুং টুং আওয়াজ করতে শুরু করেছে। আমি একটু বিব্রতই বোধ করলাম।

 

পুরান প্রেমিকের লালা টেনে টেনে গল্প বলা অনেকটুক এগিয়ে গেছে। আমি শুনছি এক্ষণ মহুয়া শারমিন কেমন করে মহুয়াময়ী স্বরে ফোনের ওপাশ থেকে আমার সামনে বসা এই চল্লিশোর্ধ্ব প্রকাশককে “হেলোঅঅঅ” বলেন। আমি আবার গল্পের দিকে কান পাতি… “হয়ছিল কি সেদিন অনেকে আসছিলো। তামজিদ পলাশ, ইব্রাহীম লোদী, মুস্তাফা জহির। আমি মহুয়ারে খেয়াল করি নাই। অন্ধকারের মইধ্যে সবাই বসছে। খাইতেছিলো। আমি মুনার কাছে বাদাম আনতে গিয়া শুনলাম মহুয়া আসছে। আন্ধারের মধ্যে দেখলাম মনে হইলো। আবার গিয়া আলাপে বসছি। এরপর আমি ফজলুল সাহেবরে ডাক দিবো বইলাই দাঁড়াইছি মহুয়ারে দেখি দরজা দিয়া আসতেছে। আমারে সে দেখে নাই। বুঝছো? সে আমারে দেখে নাই”…

 

বলতে বলতে নতুন প্রকাশক সাহেব মাঝারি উত্তেজনার তোড়ে তার পুরান প্রেমিকা মানে আমার হাতে একটা থাপড়ার মতো দিলো। আমি এই প্রথম কথা বললাম “তারপর”।‍ “তোমার হাত দুইটা ইদানিং খালাম্মা খালাম্মা হইয়া গেছে” প্রকাশক সাহেবের ফর্সা অতি চেনা ডান হাত আমার পোড় খাওয়া চামড়ার বাম হাতটাকে বেশ খামচে ধরেছে। নিজের কোছায় হাত টেনে ফিরিয়ে আনবার দায়সারা কষ্টটা করে আমি বেশ আয়েসে বললাম “এখন কি কচি হাত টার্গেট নাকি!” বলেই মনে হলো আসলে মহুয়ারে আমার অনেকক্ষণ যাবত সহ্য হচ্ছে না। যখনই নিজের এই হিসেবনিকেশহীন বুদ্ধির অসফল বাস্তবতা আমার সজাগ মস্তিষ্ক চট করে ধরে ফেললো তখনই আমি কোমল স্বরে বললাম “টিকেট আনছো? ট্রেন ছাড়বে কখন?”। প্রকাশক সাহেব আমার বাম হাতটাকে কখন যে অবহেলায় ছেড়েছেন আমারও মনে নাই তারও বোধহয় মনে নেই। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে ড্রাইভার ওসমানকে প্রকাশক ফোন করতে এগিয়ে গেলেন। আর আমি বহুদিন পর অনেক খোঁচাখুঁচির শেষে আনমনে মনে করতে পারলাম আমার ঠোঁটের ছাপ লেগে থাকা এই কালো মগটা আমার চাকুরী জীবনের প্রথম বেতনে কেনা…আমার সংসার সংসার খেলার প্রথম গুটির দান। 

 

২ 

আমার ল্যাপটপের ডেস্কে বন্ধু কবীরের তোলা একটা ফটো দেয়া আছে। ছবিটায় অনেকগুলো গাঢ় সবুজ পাতা গাছের চিকন ডাল থেকে গজিয়েছে, কিন্তু কলার মোচার মতো দুমড়ে মুচড়ে আছে। আর সে সবুজ পাতাগুলোর ভেতরে বাইরে চারপাশে হাজার হাজার টকটকে লাল পিঁপড়া। আমি ইচ্ছে করে ছবিটা চোখের সামনে মেলে ধরি। যতোবার দেখি ততোবার শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে। কিলবিল কিলবিল করতে থাকা পিঁপড়ে দেখতে থাকলে আমার কেমন জানি লাগে। কেমন জানি লাগে…চেনা লাগে…ঝিমঝিম লাগে…যেমন সামনে বসা এই মানুষটাকে আমার লক্ষ কিলবিলে পিঁপড়ার ঝাঁকের মতো শিরশিরে আকর্ষণের মনে হয়। আমি একপলক আমার ট্রেন যাত্রার সঙ্গী প্রকাশককে গাঢ় চোখে দেখে নিলাম।

 

এসি বুথের দুই সিটের কামরাটা দুলছে। আমরা সিলেট যাচ্ছি। ম্যারেড কাপলদের জন্য বিশেষভাবে বানানো মনে হয়। আমরা যখন কামরায় ঢুকছি তখন ট্রেনের চেকার সাহেব আমাদের দেখে খুব খুশী হয়েছিলেন। মনে হচ্ছিলো আমাকে আর প্রকাশক সাহেবকে দেখে তার কোনরকম সন্দেহ হচ্ছিল না। তিনি একেবারে নিশ্চিত ছিলেন আমরা দুজন বর বউ। চেকার বারবার বলছিলেন “স্যার ভাবীর কোন সমস্যা হবে না, আপনাদের কোন সমস্যা হবে না”।

কথাটা সত্য না। সমস্যা হয়েছে বহুবার, এখন ক্রমাগত সমস্যা হয়ে যাচেছ। আমার অপ্রেমিক ছেলে এবং মেয়ে বন্ধুরা ক্রমাগত আমার মোবাইলে ফোন করে যাচ্ছে। ফোনটা সাইলেন্ট করা কিন্তু রিং আসছে বলে লাইট জ্বলছে আর নিভছে। আমি ল্যাপটপের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়েও সমস্ত শরীরে জানি প্রকাশক সাহেব বারবারই আমার সেই মোবাইল ফোনের জ্বলে উঠা আলোর দিকে তাকাচ্ছেন। আমার শিরদাঁড়া ক্রমাগত টানটান হয়ে যাচ্ছে। আমি বাকযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়…

 

প্রকাশক: তুমি তো বিশাল মানুষ হয়ে গেছো দেখি..যাই হোক। তুমি সেদিন না আমারে বললা যে তোমার একটু বয়স্ক পছন্দ। শোনো এখন তুমি বিয়া করলে একটু কমবয়স দেখে কইরো। একটু বেশী বয়সের মেয়েদের ছোট ছেলেরা পছন্দ করে। আর চল্লিশের ছেলেরা কম বয়সী, টসটসা মেয়ে, বুঝছো না? ইয়াম্মি টাইপের…দেখো না সূবর্ণাকে করলো…এইরকম।

আমি: হুম

প্রকাশক: তুমি যে ইতরামি করো সেগুলা ঝানু মাল হলে বুঝে ফেলবে, ফাইস্সা যাইবা। তুমি রুনারে কি বলছো?

আমি: কোন বিষয়ে?

প্রকাশক: ইতরামি করো ক্যান? নারীবাদী মাগীদের থাইকা শিখছো? বাইচ্চা সাজো?

আমি: আমরা এই বিষয়ে কথা না বলি?

প্রকাশক: কেন্? তুমি করবা আর বলতে গেলে মিনমিন করবা? এতো ইতর ক্যান তুমি? তোমারে কী কুড়কুড়ায়?

আমি: চানাচুর…চাআআআনাচুউউউর

 

আজ বেশ ভোর ভোর ঘুম ভাঙ্গলো। শীতের তোড়ে বারান্দা থেকে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়লাম। এই বছর ঢাকায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শীত পড়ে গেছে। তাড়াতাড়িই পড়লো…কাজে যাওয়ার জন্য রেডি হয়েছিলাম। ইস্ত্রি করা শাড়ির পাট ভেঙ্গে শরীরে জড়ালাম ঠিক কিন্তু অফিসে গেলাম না। এজন্য এখন মেজাজ খিচখিচ করছে। মনে হলো এই শীতে না হয় কাজে বেরুলাম না, শাড়ির ইস্ত্রিও নষ্ট করলাম কিন্তু…কিন্তু এই এত্তো বড় শহরে কোথাও কী খানিকটা উঞ্চতার জন্য কারো কাছে যাওয়া যায়… সম্ভব…সম্ভওওওব? ভাবতে ভাবতে পুনরায় লেপের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। লাল মগের কড়া দুধচায়ের ওড়াওড়ির ধোঁয়াটা ছাড়া এই মুহুর্তে আর কেউ আমার শীতলতাকে উঞ্চতা দেয়ার জন্য নেই। ভাবতে ভাবতে পড়বার নিয়্যতে পিটার বার্টুচী খুললাম। কোলের মধ্যে ল্যাপটপ আর বামহাতে বই। ডান হাত দিয়ে বিছানায় কাত হয়ে চানাচুর খাচ্ছি। চা এবং চানাচুর…হঠাৎ খেয়াল হলো একরকম বোবা আওয়াজ কানে আসছে। গুউউউউম গু্‌উম…গুমগুম…মনে হলো শরীরের নীচে কোথাও কিছু একটার জান্তব নড়াচড়া ঘটে যাচ্ছে…মনে হয় কেউ কোন কিছুর গলা টিপে ধরেছে। নড়ে চড়ে বিছানায় হাতড়ে পাতড়ে মোবাইল খুঁজে দেখি সেটে ২২টা মিসকল উঠে আছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে ফোনের দিকে খেয়াল ছিল না। হাত থেকে বই বিছানায় রেখে কোল থেকে ল্যাপটা সরিয়ে যুত করে কে কে ফোন করেছে দেথবার আয়োজন করতে করতেই আবার  ফোন কিলবিলে ভাইব্রেশন করে উঠলো। রিসিভ করে কানে দিতেই ওপাশ থেকে পুরুষ কণ্ঠ আদুরে স্বরে বলে উঠলো “বাবুওওও..অনেকদিন পর…”

আমি: হেইইই!!!! আমি কাল ঘুমায়ে পড়েছিলাম…

প্রকাশক: আমি খেয়াল করলাম তুমি মাঝে মধ্যে কিছূ একটাতে ক্রমাগত বিজি হয়ে যাও, খোঁজ নাও না। কয়বার ফোন করছি, ধরো না কেন? সমস্যা কি তোমার???

আমি: হুম…ব্যস্ত ছিলাম।

প্রকাশক: ইদানিং কি অনলাইনে করতেছো?

আমি: পুরনো অভ্যাস।

প্রকাশক: ইতরামি করো?

আমি: চানাচুর খাই।

প্রকাশক: এটার মধ্যে লুলভাব কেমনে আসতেছে আমি বুঝতাছি না।

আমি: অবদমিত যৌনতা…

প্রকাশক: বাসায় আসবা?

 

প্রকাশকের কালো গাড়িতে উঠতে উঠতে  একবার মনে হলো এই উঞ্চতার যাত্রা আমার গল্প লেখার যাত্রারই অংশ। গল্পের জন্য চানাচুরে কাজ চলে না। ঘ্রাণের প্রয়োজন হয় কিংবা কাঙ্খিত উঞ্চতার জন্য গল্পের বাহানা। মহুয়া নাই হলাম। কানটুপিও নাই আমার। অন্তত বয়সের নারী হয়ে চল্লিশের সাথে যাত্রাটা তো করতে পারছি! ঠিক সেসময় এফবির এক বন্ধুর অনলাইনে লেখা একটা লাইন মাথায় ঘুরতে শুরু করলো “প্রেমের চক্করে পাথর খাইয়া হজম করিয়া ফালাইয়াছে যে, সে সবই খাইতে পারে”… মানব, চানাচুর সমেত সবই খাইতে পারে… 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: