তুহিন তৌহিদের কবিতা

বোতাম

 

অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে- চোখের মণি, বুকের বোতাম
বুকের বোতাম- আমার প্রিয় রঙিন বোতাম
হারিয়ে গেছে
চোরাবালির এই সময়ে
প্রিয় সকল কাচের বাসন ছিটকে পড়ে ভেঙে গেছে

সাগর সাঁতরে কূলের কাছে
সাঁতার কাটতে ভুলে গেছি
যত্নকরে রেখে দিলাম পাথরগুলো
না হয় একটা জীবন এমন কেটে গেলো
বুকটা খালি বুকের বোতাম
হঠাৎ কোথায় পড়ে গেছে, খোঁজ পাইনি

 

পাখি ও ঘুড়ি

 

স্বপ্ন ছিলো পাখি হওয়ার গানের পাখি
চৈত্রমাসের জ্বলা রোদে যে পাখিটি
শেওড়া গাছের ঝোপে বসে গান গাইবে
আঘাত এলে না থেমে যে অবলীলায় চালিয়ে যাবে
এক জনপদ ছেড়ে অন্য জনপদে

স্বপ্ন ছিলো পাখি হওয়ার যে পাখিটি সব আকাশে
ইচ্ছে মতো উড়ে যাবে বাধাবিহীন
কিন্তু এখন দেখছি সুতোয় বাধা ঘুড়ি
দৃশ্যহীন এক সুতোর টানে ঘুরছি শুধু

স্বপ্ন থাকে পাখি হওয়ার সব মানুষের
একদা সে দেখে নিজে সুতোর ঘুড়ি

 

ঘুণপোকা

 

ঘুণপোকা প্রকাশ্যে খায় না
তার খাওয়ার শব্দে কারো ঘুমও ভাঙে না
অথচ যখন অকস্মাৎ ভেঙে পড়ে অনিন্দ্য অবয়ব
বলি, ঘুণপোকা খেলো

শহরের সুদৃশ্য প্রাসাদ থেকে এককালে বৃদ্ধ ইট খসে
ডোবা ও পুকুরে জমা হয় শ্যাওলা ও ময়লার স্তুপ
আর যে বকটি
নিয়মিত আসতো সে কচুরিপানার ঝোপে
সে তখন চলে যায় দূরের আকাশ ঘেঁষে
বয়স্ক গাছের পাতা ঝরে
গ্রামের রাস্তার পুরাতন লোহার সেতুটি
আচানক ভেঙে পড়ে- ঘুণপোকা
নিঃশব্দে খেয়ে চলে

 

পিঁপড়ার দঙ্গল

 

পিঁপড়ার দঙ্গলে ভেসে গেছি কালরাতে
বানের জলের মতো শত শত হাজারো পিঁপড়া
লাল কালো খয়েরি পিঁপড়া
সারাদেহে এমত ছড়িয়ে গেছে
তিলস্থান কোথাও শূন্য ছিলো না
সারিবদ্ধ পিঁপড়ারা সুতা হয়ে ফিরে যেতে যেতে
আমার টুকরো মাংস মুখে নিয়েছিলো
আমি তবে নিহত ছিলাম?

প্রলয়ের লীলাঘরে প্রতিরাতে কী প্রবল নিঃসঙ্গ নিরাই
পিঁপড়ার দঙ্গলে ভাসি
ঘরময় অগণিত লাল কালো খয়েরি পিঁপড়া
প্রজাপতি কোথাও দেখি না।

 

গোল্ডফিস

 

এইসব গোল্ডফিস এক্যুরিয়ামের কাচের দেয়াল ছেড়ে
বের হতে পারে না, অথচ কী সহজে ঘুরছে, নিজের
রঙিন ডানায় ভর করে- বুদবুদ তুলে লালনীল
ঝাঁক ঝাঁক গোল্ডফিস- কোনো এক গান করে
প্রত্যেকে নিজের মতো নিঃসঙ্গ নীরব
শুনতে পায় না কেউ অস্ফুট নীনাদ

পৃথিবীর এক্যুরিয়ামে আমরাও চিরায়ত গোল্ডফিস
লালনীল হরেক ডানার

 

সমাধিও সমাহিত হয়

 

শ্যাওলা ধরেছে পিঠে- ঝোপের ভেতর
দেখা যায় একপাশ ভেঙে পড়ে গেছে
মাটির উপরে গড়া মাটির প্রাসাদ
সময় অশ্বের ক্ষুর ধ্বংসনৃত্য করে

ফিরে মাঠে-সৌধে-রাজা ও রাজ্যের বুকে
সমাধিও সমাহিত হয় একদিন

 

এটিএম বুথ

 

গলির প্রত্যেক মোড়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছেন
কেমন রূপসী তিনি, রঙ-চঙা আলোঝলমলে
আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ
ঘঁষলেই ফোটে ওঠে কাক্সিত মুকুল।
অবগুণ্ঠনে ঢেকে দিলে তিনিও লাজুক
অপোয়
অতঃপর অন্য কেউ ঘোমটা সরিয়ে
ছুঁয়ে দিলে ভুলে যান অতীতের স্মৃতি
এমনই নির্মোহ তিনি
কারো কোনো স্পর্শে তার অসম্মতি নেই।

 

অর্ফিয়ুস

 

বাঁশির করুন সুরে বেজে ওঠে ইউরিদাইস
আকাশের নীলে নীলে বেজে ওঠে ইউরিদাইস
স্বর্গ-মর্ত্য কাঁপে, কেঁপে ওঠে অলিম্পাস চুঁড়া
জিউসের সোনালী আসন
বাঁশিতে একটি সুর, ইউরিদাইস।

এ-বনপ্রান্তরে আমি বিরহের অক্টোপাস জালে
এমত চিৎকার ছাড়া কি আর আমার কাছে আছে
অর্ফিয়ুস কিছু নয় ইউরিদাইস ছাড়া একা
অর্ফিয়ুস নীল রক্তে দুর্বিনীত ব্যাকুল পিপাসা।

এ বাঁশি বাজবে, এতে সুপ্ত আছে শোকের মাতম
সবকিছু কেঁপে ওঠে, সবকিছু ধ্বসে পড়ে যাক
নিঃসঙ্গতার কালো পর্দা গায়ে আমি নই অন্য কোনো কিছু
অর্ফিয়ুস অস্তিত্বের অন্য নাম ইউরিদাইস।

 

টাইরেসিয়াস

 

যার ভেতরের চোখ খুলে যায়, তার যদি এই
চর্মচু অন্ধও হয়, কি আসে যায়
স্পষ্টই আমি দেখছি তোমার পরাজিত মুখ
নিজের দুচোখ উপড়ে ফেলছো, উন্মাদ প্রায়

কী, আমাকে তুমি মিথ্যা বললো, কচু কাটা দেবে
তোমার ধারালো তরবারি দিয়ে শিরোচ্ছেদের
হুমকি দেখাও? জেনে রাখো এই টাইরেসিয়াস
সত্য প্রকাশে পাহাড় সমান দৃঢ় ও অনড়

যেখানে রাজ্যে দুর্দশা এতো- প্রজাদের মনে
এতো লোভ জমা- অনাহার আর আর্তনিনাদ
সেখানে কিভাবে থাকবে সোনার পালঙ আঁকড়ে
মাতৃপ্রণয়ে- পৃথিবীর কোনো নিয়মে তা নেই

পিতার রক্তে রাঙা তরবারি হাতে নিয়ে জেনো
যুদ্ধের মাঠে বেশিদূর কেউ যায় না মোটেও
নিজের ঘাতক হয়ে ওঠে এটা- নিজেকেই কাটে
অভিশাপ এতো ভারি- তার মতো আর কিছু নেই

অন্ধ দুচোখে আমি দেখি দূরে, শান্তি কোথায়
রক্তের দামে কে-বা কোন কালে শান্তি জোটায়…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: