রীতা রায় মিঠুর গল্প ফেলুরানীর আমেরিকা দর্শন

ভদ্রমহিলার নাম ফেলুরানী। ফেলু নামটা এসেছে ফালানী থেকে। তার যখন বিয়ে হয়, তখন তার বয়স ছিল ঊনিশ বা কুড়ি বছর। এক পাড়াতেই তার বাপের বাড়ী ও শ্বশুরবাড়ী। সেই কারনেই সকলেই সকলের পরিচিত। ফেলুরানীর বড় ননদ (ননাশ) থাকতেন কাছাকাছি বাড়ীতে, সেই ননদের তিন ছেলে, এক মেয়ে, আর শ্বশুরবাড়িতে ছিল তারই কাছাকাছি বয়সী দুই ননদ, সবাই মিলে ছিল খুবই হৈহল্লা মার্কা আনন্দের পরিবেশ।

ফেলুরানীর বাবার বাড়ীতে কেমন পরিবেশ ছিল তা বুঝতে হলে একটু পেছনে তাকাতে হবে। ফেলুর বাবা ছিলেন খুবই ভোলাভালা টাইপ মানুষ, দেখতে হুবহু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত, আর ফেলুর মা হয়ত খুব সুন্দরী ছিলেন যৌবনে, কিনতু ফেলুর বিয়ের সময় উনার বেশ বয়স হয়ে যাওয়াতে সৌন্দর্য্যটুকু আর বুঝা যেতোনা। ফেলুর বাবার টাইটেল ছিল ভৌমিক, কিনতু বাঙ্গালের মুখের ভাষার বদৌলতে ভৌমিক হয়ে গেছে ‘ভুঁইয়া’। তো সেই ‘ভুঁইয়া’ বাবুর ছিল মিষ্টির দোকান। ভুঁইয়া বাবু এমনই সরল সোজা মানুষ ছিলেন যে তার ব্যবসা কে যে কোথা দিয়ে লুটে পুটে খাচ্ছিল তার কোন হদিস করতে পারতেননা তিনি।

ভুঁইয়া বাবুর চার মেয়ে এক ছেলের পরে আবার আরেকটি মেয়ে জন্মায়। তখনকার আমলে একধরনের বিশ্বাস কাজ করত মানুষের মনে, যদি অধিক সন্তান না চায় কেউ, তাহলে শেষ সন্তানটির নাম রাখত আন্না, অথবা খেঁদি, অথবা কুট্টি আর নাহলে ফালানি। ফেলুরানীর পরে আর কোন সন্তান চাননি ভুঁইয়া দম্পতি, তাই পরীর মত সুন্দর মেয়ের নাম রেখেছিলেন ফালানি। কিনতু ফেলুরানীর জন্মের পরে আরও দুই ছেলে মেয়ের জন্ম হয়েছে ঐ ভুঁইয়া পরিবারে, তবে তাদের নামকরন আর এমন হেলাফেলা ধরনের হয়নি, দেবতার নামে নামকরন হয়েছিল বলেই বোধ হয় ঐ দুই সন্তানের পরে তাদের আর কোন সন্তান হয়নি।

ফেলুরানীরা সব ভাইবোন দেখতে খুব সুন্দর ছিল। কিনতু পড়ালেখার ব্যাপারে মনোযোগী ছিলনা। এতগুলো সুন্দরী মেয়ে নিয়ে ভুঁইয়া বাবু বড়ই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন খুব সম্ভবত, তাই টপাটপ করে মেয়েদেরকে যার তার হাতে পাত্রস্থ করে দিয়ে ফেলুরানীতে এসে একটু দমেছিলেন। আর ফেলুরানী ছিল পড়ালেখায় বড় ফাঁকিবাজ, প্রাইমারী স্কুলের গন্ডী পার হননি তিনি, ক্লাস ফোর পাশ করে পড়ালেখা সাঙ্গ করে ঘরে বসে ভেরেন্ডা ভেজেছেন। স্বাধীনতার পর পর ফেলুর স্বামী ফেলুর প্রেমে পড়ে যায়। এ প্রেম যেন তেন প্রেম না, মারাত্মক প্রেম। তবে ফেলুরানী এই প্রেমের ভাষা তেমন বুঝতোনা, তাই ফেলুর স্বামী তার ভাগ্নের হাতে চিঠি গুঁজে দিয়ে বলতো চিঠিটা সঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে। ভাগ্নেকে একটু খাবারের লোভ দেখিয়ে এই কাজটা করতো তার মামা। আর এদিকে ভাগ্নেকে ফেলুর কাছে পাঠিয়ে নিজে বাড়ীর বারান্দায় পায়চারী করতো আর শিস দিয়ে ‘ ঐ পদ্মচোখের নীল যমুনায় আমি ঝাঁপ দিয়েছি’ গানের সুর ভাঁজতো। মামাবাবুর এই একটা অসাধারণ গুণ ছিল, হারমোনিয়াম বা হারমোনিকা তে যে কোন গানের সুর বাজাতে পারতো, শিস দিয়েও দারূন সুর বাজাতে পারতো।

মামার সাধনা বৃথা যায়নি, ভুঁইয়া বাবু শেষ পর্যন্ত মামার হাতেই ফেলুরানীকে তুলে দিয়ে ভাগিনা-ভাগ্নীর ‘ফেলু মামী’ হওয়ার সুযোগ করে দিলেন। বিয়ের পরেই ভাগ্নে-ভাগ্নীর সাথে মামীর খাতির হয়ে গেলো। এই খাতিরের সুবাদেই এত ঘটনা জানা গেলো ফেলুরানীর কাছ থেকে। ফেলুর দুই ননদ ও ভাগ্নেরা একটা জিনিস আবিষ্কার করে ফেললো, ফেলুরানী ঠাট্টা তেমন একটা বুঝেনা আর আধুনিক জীবনের অনেক কিছুই জানেনা। ফলে সমবয়সী ননদেরা খুব ঠাট্টা করতো বৌদির সাথে, ফেলুরানী না বুঝে উলটা পালটা মন্তব্য করে ফেলতো, আর হাসির রোল পড়ে যেতো। সবচেয়ে বেশী ক্ষেপাতো ফেলুর স্বামীর ‘ঐ পদ্মচোখের নীল যমুনায় আমি ঝাঁপ দিয়েছি’ গানের শিস বাজানোর কথা বলে। তবে এইসব ঠাট্টা নিয়ে মাথা ঘামাতোনা ফেলু, সে তার স্বভাবমত উল্টা-পাল্টা মন্তব্য করেই যেতো।

বিয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে যখন প্রথম বানিজ্য মেলা হয় ঢাকাতে, যেটা ‘একজিবিশান’ নামে পরিচিত ছিল, সেই একজিবিশানে নিয়ে গেল ফেলুরানীর স্বামী ফেলুকে ,বোনদেরকে এবং ভাগ্নে ভাগ্নীকেও। সবাই যখন ঢাকা শেরেবাংলা নগর( সঠিক নাও হতে পারে) একজিবিশানে মাঠে ঘোরাঘুরি করছিল, রোমান্টিক স্বামীতো বউকে খুশী করার জন্য এটা দেখায় ওটা দেখায়, কিনতু ফেলুরানী হঠাৎ করে বলে উঠে, “ এতক্ষন ধইরা হাঁটা হাঁটি করতে আছি, কিনতু একজিবিশনতো এখনও দেখলামনা, হাঁটাহাঁটিই শুধু সার”!! অন্য সবার কথা বাদ, এই কথা শুনে ফেলুর আট বছর বয়সী ভাগ্নীটা পর্যন্ত হেসে খুন।এই প্রথম ফেলুরানী একটু থতমত খেয়ে যায় এমন কথা বলে।

তবে ধীরে ধীরে ফেলুরানীর বুদ্ধি বিকশিত হতে থাকে। ফেলু নিজে প্রাইমারী স্কুলের গন্ডী পার হয়নি, কিনতু বড় ননদের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার তুখোড়পনা তার ভাল লেগে যায়। নিজের যখন ছেলে হয়, সেই ছেলের চার বছর হতে না হতেই হাতে শ্লেট পেন্সিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার ছেলেটা ছিল দেখতে যেমন সুন্দর, স্বভাবটা ছিল আরও অনেক বেশী সুন্দর। ফেলুরানীর ভাগ্নে ভাগ্নীরা সকলেই যার যার ক্লাসে সেরা, তাই ফেলুরানীও হাতে একটা বেত নিয়ে ছেলের পাশে বসে থাকে আর অযথাই শাসন করতে থাকে ছেলেকে। সবসময় দাদা দিদিদের উদাহরন দেখায়, তা ছেলে কিনতু খুব ভালো শিক্ষা পেয়েই বড় হতে থাকে।

এদিকে ফেলুরানীকে নিয়ে সবার হাসিঠাট্টা অব্যাহত থাকলেও ফেলুর ননদ-ননাশ, ভাগ্নে ভাগ্নীরা মিলে ফেলুকে সহযোগীতা করতে থাকে, ছেলেটাকে বড় করার ব্যাপারে। যারা হাসাহাসি করে তাদের দোষও দেওয়া যায়না, যেমন একদিন ফেলুরানী তার বড় ভাগিনাকে এসে বললেন, ‘ ভাগিনা, এক কাজ করতে হবে, একটা ‘এপ্লিবিশন’ লিখ্যা দিতে হবে তোমারে’। এই ভাগিনা আবার অত দুষ্ট টাইপের ছিলনা, সে মামীকে বললো,’ মামী, কথাটা হবে ‘এপলিকেশান’ এপ্লিবিশান না”। কিনতু বড় ভাগিনা আর কতবার সামলাবে, আরেকদিন মামী এসে বললো, উনি একটা ফ্রীজ কিনতে চান। ভাল কথা, কোন ব্র্যান্ড পছন্দ জিজ্ঞেস করতেই বলে দিলেন ‘মিসসুপিসি’। কার বাড়ীতে যেনো শুনে এসেছে ‘মিতসুবিসি’ ভাল ব্র্যান্ড, সেটাই ঘরে এসে হয়ে গেছে ‘মিসসুপিসি’! আরও আছে ঘটনা, উনি ‘সসপ্যান’ কে বলেন ‘সসম্যান’, টমেটো সস কে বলেন ‘টমেটো সলস’। উনার এক প্রতিবেশী বান্ধবীও ‘টিয়া পাখীকে’ বলে ‘টিকা পাখী’।

ফেলুরানীর ছেলেমেয়েরা বেশ বড় হয়ে গেছে, ভাগ্নীর বিয়ে হয়ে গেছে, ভাগিনাদের বউ সংসার হয়েছে। তারও অনেক আগেই দুই ননদের বিয়ে হয়ে গেছে। শাশুড়ীও মারা গেছেন, এখন ফেলুরানীর অখন্ড অবসর। মুখে পান গুজে পাড়া বেড়াতে যান, ফিরে আসেন রাজ্যের যত গল্প নিয়ে। একদিন ঘরে এসে আফসোস করে বলতেছেন, ‘ হুম! মানুষের কপাল, ঐতো ওপাড়ার দীপ্তির মা-বাবা অস্ট্রেলিয়া গেছিলো মাইয়ার কাছে, রাস্তার ধারে ধারে কত আপেল কমলার গাছ। দীপ্তির বাবা আপেল বাগানে কাজ পাইয়া আপেল কুড়াইয়া কত ডলার যে রোজগার করছে! ইশ! আমার মাইয়াটার যদি বিদেশে বিয়া হইত, তাইলে আমিও আপেল বাগানে কাজ কইরা ডলার কামাইতাম!” উনার মেয়ে তখন অনেক ছোট, পারলে উনি মেয়েকে তখনই টান মেরে বড় করে ফেলেন আর কি! তার ভাগ্নে ভাগ্নিরা সবাই মামীকে ভর্ৎসনা করতো এমনসব উলটা পালটা কথা বলার জন্য। তার ছেলেমেয়েরাও মা’কে বকা দিত এমন আহা উহু করতো বলে।

এরপর ফেলুরানীর মাথায় নতুন বুদ্ধি বের হয়। ডিবি লটারীর জন্য মরীয়া হয়ে উঠে। তার একটাই কথা, একবার আমেরিকা যাইতে পারলে আর কোন চিন্তা থাকবেনা। ছেলেটা, মেয়েটা অনেক ভালো ভালো পুষ্টিকর খাবার পাবে, তাদের স্বাস্থ্যও খুব ভাল হয়ে যাবে। আবার একটা দাবড়ানী খেয়ে খিছুদিন দম ধরে থাকলো। এরপরেই হঠাৎ করেই তার মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় আমেরিকাবাসী ছেলের সাথেই। ব্যস! আবার সবাই মিলে পড়লো ফেলুরানীকে নিয়ে। সবাই ঠাট্টা করতে লাগলো, কবে বঙ্গবাজার যাবে, কবে জিন্সের প্যান্ট কিনবে, শার্ট কিনবে বলে এইসব ইত্যাকার হাবিজাবি কথা। ফেলুরানী চুপ করে থাকে, আর নানাজনের কাছে খোঁজ নেয়, ছেলে বা মেয়ে কতদিনে মা-বাবাকে আমেরিকা নিয়ে যেতে পারে, এই ব্যাপারে নানাজনের কাছে প্রশ্ন করে যায়। ততদিনে আমেরিকার অনেক মা বাবার সাথে উনার কথা হয়ে গেছে! মেয়ে যদি দেশে ফোন করে, মায়ের একটাই প্রশ্ন,” তোর সিটিজেন হইতে আর কতদিন লাগবো! আমাগোরে নেওনের কাম নাই, তোর দাদারে লইয়া যা”। মেয়ে হয়তো বুঝিয়ে বলে যে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নাই, কিনতু মায়ের মন মানেনা।

একদিন ফেলুরানীর স্বপ্ন হাতের মুঠোয় ধরা দেয়। মেয়ে সিটিজেন হয়ে গিয়ে মা-বাবার জন্য এপ্লাই করে। আমেরিকার কাগজপত্র তৈরী হতে যে কত রকমের ফ্যাকরা, যারা এর ভেতর দিয়ে গেছে তারাই শুধু বলতে পারবে এই ব্যাপারে। একবছর পার হয়ে যায়, কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ফেলুরানী একসময় হতাশ হয়ে পড়ে। তার মনে হয়, এই জীবনে বুঝি আর আমেরিকা যাওয়া হবেনা। এর মধ্যেই মেয়ের ঘরে একটি ফুটফুটে বাচ্চাও জন্মে যায়, অথচ ফেলুরানীর ভিসা আর হয়না। ভিসার কাগজপত্র প্রায় শেষের দিকে, এমন সময় হঠাৎ করেই ফেলুরানীর সেই রোমান্টিক স্বামীর হার্টে সমস্যা দেখা দেয়, ডাক্তারের পরামর্শে উনার বাই-পাস সার্জারী হয়। মেয়ে যায় দেশে বাবাকে দেখতে এবং সব কিছু রেডী করে দিতে। ফেলুরানীর ছেলে মেয়ে দুইজনেই খুব স্মার্ট হয়েছে, বাবা-মায়ের মত এত ঘাবড়ে যায়না। এদিকে ফেলুরানীর বড় ননদের যে মেয়েটা ছিল, তারও বিয়ে হয়ে গেছে অনেক দিন আগে, সেও স্বামী সন্তান নিয়ে আমেরিকা থাকে। দুই বছর পর পর দেশে আসে মা বাবা কে দেখতে। যেই বছর ফেলুরানী আমেরিকা যাওয়ার ভিসা পেলো, সেই বছরের মে মাসের দিকেই ভাগ্নী দেশে যাওয়া ঠিক করলো। ব্যস, ফেলুরানী ঠিক করে ফেললো যে মেয়ের সাথে না গিয়ে আমেরিকা যাবে ভাগ্নী ও নাতনীদের সাথে। ভাগ্নীর মেয়েদের সাথে ফেলুরানীর খুব ভাব ভালোবাসা আছে। নাতনীরা তাকে ডাকে ‘সুন্দর দিদা’ বলে।

ভাগ্নীতো সময়মতো দেশে গেলো কিনতু বিধি বাম থাকায় আমেরিকা সরকার ফেলুরানীদের আমেরিকা যাওয়ার সময় নির্দিষ্ট করে দিল। ফলে মামা মামীকে একমাস আগেই যেতে হবে দেখে ভাগ্নী একটু চিন্তায় পরে গেলো। কিনতু মামীর ভাগ্নে-ভাগ্নীরা মামার তুলনায় মামীকে বেশী বুদ্ধিমতি ও স্মার্ট মনে করে। ভাগ্নী এসেই মামীকে সাহস দিতে লাগলো আর একটা একটা করে শেখাতে লাগলো কিভাবে কিভাবে আমেরিকা মেয়ের বাড়ীতে পৌঁছাবে। মামী তার বান্ধবীদের কাছ থেকে টিপস নিয়েছে, সাথে করে দুনিয়ার মসলাপাতি, পান-সুপারী, সুপারী কাটার যাঁতা সহ চাল ডাল আচার, পাঁপড় আরও কি কি যেনো নিয়ে স্যুটকেস ওভার ওয়েইট করে ফেললো। ভাগ্নী আবার সব নামিয়ে, নতুন করে গুছিয়ে স্যুটকেস ওজন করে টরে ঠিক করে রেখে বাপের বাড়িতে গেছে কয়দিনের জন্য। মামীর যাওয়ার দুইদিন আগে এসে দেখে মামা মামীতে হুলুস্থুল কান্ড। মামা হলেন বাইপাস সার্জারীর রোগী, চিৎকার চেঁচামেচী নিষেধ, অথচ মামাই রাগারাগী করছে দেখে ভাগ্নী মামাকে ধমক দিয়ে শান্ত করে পরে জানতে পারলো, মামী আগের ওজন করা স্যুটকেস আবার ভারী করে ফেলেছে। মহা ফাঁপড়ে পড়ে গেলো সবাই এই দুই স্বামী-স্ত্রীকে নিয়ে। পরিবেশ হালকা করার জন্য ভাগ্নী মামাকে নিয়ে ঠাট্টাও করে এই বলে যে, মামা কি এখন আর মামীর পদ্মচোখ দেখতে পায়না নাকি! যাই হোক আবার লাগেজ ঠিক করে দিয়ে মামীকে ওয়ার্নিং দেয়া হয়, এরপর আর কোন সাহায্য করা হবেনা।

এবার মামীকে রেডী করার পালা। দুইদিন ধরে তোতা পাখীর মত শেখানো হয়েছে, এয়ারপোর্টে গিয়ে কিভাবে মামার জন্য হুইল চেয়ার চাইতে হবে, কিভাবে ভিসা সঙ্ক্রান্ত কাগজ পত্র দেখাতে হবে, প্লেনের ভেতর কিভাবে এয়ারহোসটেসকে ডাকতে হবে, এইসবকিছু। মামী কিনতু ধরতে পারে খুব তাড়াতাড়ি। তাই ভাগ্নী বলে দিল যে আর কিছু যদি না পারেন, তাহলে শুধু হাত তুলে বলবেন,’ নো ইংলিশ, হেল্প প্লীজ, মাই হাজব্যান্ড, সিক, হার্ট পেশেন্ট, হেল্প’, শুধু এটুকু বললেও দেখবেন হেল্প পাবেন’। আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিল, ‘শুনেন নিউইয়র্কে বা যে কোন জায়গায় গিয়ে কালো মানুষ দেখলে আবার ‘নিগ্রো’ বলে ফেলবেননা, বলবেন ‘ব্ল্যাক’। একবেলা পরেই ভাগ্নী মামীর পরিক্ষা নিলো, প্রথমবার মামী ফেল। মামীকেই শেখানো হচ্ছে কারন মামা একেবারেই বাতিলের খাতায়, কিনতু মামী দেখতেও সুন্দরী, তাছাড়া আসলেই চলনে বলনে অনেক স্মার্ট। কালোকে কি বলবেন জিজ্ঞেস করতেই বললো,’নিগ্রু কমু’। ভাগ্নী হাসতে হাসতে বললো,’নিগ্রু কইলে সেই নিগ্রু বেটা বা বেটি আপনাকে মাথার উপর তুলে দিবে একটা আছাড়’। যাই হোক ভাগ্নী আর নাতনী মিলে রওনা হওয়ার দিন খুব ভোরে ফেলুরানীকে যখন শাড়ী পিন আপ করে পরিয়ে তৈরী করে দিল, কারো বলার ক্ষমতা রইলোনা যে এই স্মার্ট মহিলাটি আসলে ফেলুরানী বা ভুঁইয়ার মাইয়া ফালানী।
দুইদিন দেশে সকলেই খুব টেনশানে থাকলো, কারন প্লেন কোথায় যেন গিয়ে যান্ত্রিক গোলযোগের কারনে আটকা পড়েছিল, সবাই জানতো ফেলুরানীর স্বামিটির মাথা গরম হয় তাড়াতাড়ি। শেষ পর্যন্ত ফেলুরানী ও তার স্বামী আমেরিকা এসে পৌঁছালো। মেয়ের ঘরের নাতিকে নিয়ে সময় কাটে ফেলুরানীর, কিনতু তার স্বামীর মন ছুটে চলে যায় দেশে। এভাবে টানাপোড়েনের ভেতর থাকতে থাকতে একদিন ফেলুরানীর স্বামী দেশে চলে যায় ছেলের কাছে আর ফেলু রানী থাকে মেয়ের সংসার আগলে।

ফেলুর ভাগ্নী ফিরে এসেছে দেশ ঘুরে, মামীর সাথে ফোনে গল্প হয়, মামার খুব শখ ছিলো ভাগ্নীর বাড়ীতে আসার। কিনতু সুযোগ আসছিলোনা কোনমতেই। হঠাৎ করেই একবার সুযোগ এসে গেলো ভাগ্নীর বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ করে। সবকিছু ঠিকঠাক, মামা –মামী আসবে, ভাগ্নীর মনে আনন্দ আর ধরেনা, মামীর সাথে ভাগ্নীর খুবই গভীর সম্পর্ক, সবকিছু পরিকল্পনা হয়ে যাওয়ার পর জানা গেলো যে উনারা আসতে পারবেননা কারন তাদের হেলথ ইন্স্যুরেন্স পলিসি রিনিউড হয়নি। সবার মন খারাপ হয়ে গেলো, মামাও দেশে চলে গেলো, মামীও খুব মন খারাপ করে থাকলো।

তা এই শীতেই ভাগ্নীর মেয়ে তার বরকে নিয়ে এতদূর গেলো সুন্দরদিদার সাথে দেখা করতে। সুন্দরদিদা এতদিন পরে নিজের একজন মানুষকে পেয়ে খুশীতে উচ্ছসিত হয়ে উঠলো। ভাগ্নীর সাথেও কথা হচ্ছিলনা মামীর, দুজনেই যার যার কাজে ব্যস্ত বলে। এরমধ্যেই একদিন মামীর মেয়ে ফোন করলো তার দিদিকে। কথা প্রসঙ্গে জানালো যে দিদির মেয়ে, তার বর ও তাদের সুন্দরদিদা দুইদিন ধরে খুব বেড়াচ্ছে। কথা বলতে বলতেই সকলেই বেড়ানো শেষে ঘরে এসে পড়েছে আওয়াজ পেয়েই ভাগ্নি তার বোনকে বললো যে সে তার মামীর সাথে কথা বলতে চায়। মামী এসে ফোন ধরলোঃ
মামীঃ হ্যালো ভাগ্নী, কেমুন আছ? এখন আমি অনেক টায়ার্ড, ভুল কইরা ‘এসপেস ট্রেনে’ উইঠ্যা পড়ছিলাম। আর এই ঠান্ডার মইদ্যে চড়কী ঘুরা ঘুরছি। অখন আমার কথা কওয়ার শক্তি নাই, ঠান্ডায় জইম্যা গেছি।“

ভাগ্নীঃ” মামী, ‘এসপেস (এক্সপ্রেস) ট্রেনে কেমনে উঠলেন, সাথে না আপনার নাতনী জামাই, নাতনী ছিল, তারাও বুঝলোনা! আহারে! ঠিক আছে রেস্ট নেন, কিন্তু একটু বলেন কেমন দেখছেন সবকিছু।“

মামীঃ ‘ শোন, নাতনী জামাই খুবই ভালো, তার অন্তর –বাহির দুইই ভালো( মামী মাঝে মাঝে দার্শনিক কথা বলে)।আমারে অনেক যত্ন কইরা ঘুরাইছে। তারপরে নাতনী আমারে ‘জাপানী রেস্টুরেন্টে’ খাওয়াইছে। কি জানি কয় একটা সিম না কি জানি ( ভাগ্নী বলে দিল, সুশী), হ হ সুশী খাইছি, আঠা আঠা ভাতের মধ্যে চিকেন( মামী চিকেন খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, কিনতু নাতনী জামাইয়ের সামনে কোন দূর্বলতা দেখাতে চায়নি), তারপরে নুডুলস, সবই খাইছি। সুশী সবচেয়ে ভাল খাইছি, ঝাল সইরষা বাটা মাখাইয়া মাখাইয়া খাইছি, খুবই ভালো( ভাগ্নী খুব অবাক হয়ে গিয়ে জানতে চাইলো যে মামী সত্যি সত্যি সুশী পছন্দ করেছে কিনা, কারন এত বছর বাইরে থেকেও ভাগ্নী এইসব সুশী ফুশী কখনও খায়নি)। তারপর শোন, মোম দিয়া মানুষ বানানো মিউজিয়ামে গেছি, শাহরুখ খান, অমিতাভবচ্চন, ক্লিন্টন, ওবামা সবার লগে ছবি তুলছি। এরপর জাহাজে কইরা গেছি ‘স্টেচু’ দেখতে(স্ট্যাচু অব লিবার্টি), ঐখানে এমুন বাতাস যে আমি দাঁত কপাটি লাইগ্যা পইড়া যাওয়ার যোগার, কিনতু নাতনী জামাইতো দিদা দি্দা করতেছে। নাতনী কইলো যে এতদূর আইসা স্টেচু না দেইখ্যা যাওয়াটা ঠিকনা, তখন ঐ জাহাজে এক দারোয়ান( শিপ গার্ড) মত একটা বেটা নাতনী জামাইয়ের দেখাদেখি আমারে কয়, দিদা ওয়েইট, আই হেল্প ইউ’ কইয়া ধইরা ধইরা বাইরে আইন্যা স্টেচু দেখাইয়া আবার ভিতরে বসায় দিয়া গেছে।“

ভাগ্নীঃ মামী আপনার কি ভালো লাগছে মামারে ছাড়া এতকিছু দেখতে?

মামীঃ হ আমার খুব ভালো লাগছে দুইটাদিন। তোমার মামারে এই ওয়েদারে বাইরে নিলে নিমুনিয়া অইয়া হিটকি লাইগ্যা থাকতো, হাসপাতালে নেওন লাগতো, স্টেচু আর দেখন লাগতোনা” বলেই ফেলুরানীর যে কি হাসি! তার হাসি শুনেই বুঝা গেলো যে সে সত্যিকারের আনন্দে কাটিয়েছে দুইটাদিন, তার সেই স্বপ্নের আমেরিকাতে!!!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: