অজয় রায় এর কবিতা

ক্রীতদাস নই, সম্রাট

আমি বাংলার পবিত্র ভোর কোলে ক’রে এসেছি।

সরষে ক্ষেতের হলুদ বেণী বাঁধা সকালের রোদ;
আর ময়ূরের নরম পাখায় নেমে আসা নর্তকী-মেঘ,
আমি নিয়মিত অনামিকায় পরি−
আমি ক্রীতদাস নই, আমি সম্রাট।

শুধু শহরের নির্মম অপূর্ণতা ঠেলেছি দু’হাতে।

ঝর্ণার রূপালী আয়নায়  আমি দেখি পৃথিবীর স্নান−
ফসলের হলুদ আঙুলে দেখি জাগতিক সোনালী সুদিন,
আর বুকে তুলি মাটির মিষ্টি কোকিল ; একটি পাতার কিশলয়
আমি ক্রীতদাস নই , আমি সম্রাট
আমি এক হলুদ রাজা।

শহরের নির্মম বুকে আমি পাতার সানাই শুনি না।
চাঁদের রূপালী চন্দ্রহার দেখি না শহরের গলায়।
গোপনে তুলি তাই পল্লীর একথালা শরৎ-সকাল ;
একটি শিমুলের সুস্মিতা লজ্জা ; মাটির পরিপ্লুত হাসি।
আমি সম্রাট, আমি এই সব ভালবাসা মাটির মোহরে কিনি।

আমার মাথায় মাটির মুকুট, পৃথিবীর ফলন্ত করবী−
হাতে তুলি নীল পদ্ম-দীঘির অভিমান, ঘাসের শ্যামল ঘুম,
চোখে তুলি রেশমী মেঘের একটু আড়াল, মাটির মায়াবী পলল
আমি মাটির সম্রাট, আমি ক্রীতদাস নই−

আমি বাংলার পবিত্র গোধূলি কোলে করে এসেছি−
সন্ধ্যায় আমি সোনার প্রজাপতির মত ফুলে রাখি চোখ,
দিনে দেখি সোনালী স্বপ্ন-কলি, বিকালে রাতের স্নিগ্ধ প্রত্যয়−

আমি হাতে তুলি যুথীর চুম্বন
একটি পলাশ ঘিরে−
আমার পৃথিবী স্বপ্ন গড়ে রাজা ও রাজ্যের
রাণী আমার বকুল বধূ।
প্রজা−গোধূলির অনন্ত রাজহাঁস; শুভ্র-সুন্দর-কিশোরী,
আমার রাজত্বের সবখানে সবুজের স্নিগ্ধ পাতামাখা ঘর।

গ্রীন হাউজের অশ্রু তাই−
আমার রাজ্যে কোথাও নেই
আমি কৃতদাস নই, আমি সম্রাট, আমিই সম্রাট।

নন্দিনী কাঁদে নাতো !

ময়ূরী উঠোন সবুজ ধান হ’য়ে
নেমে গেছে মাঠে।
একাকী পলাশ পায়ে চলে গেছে পথ−
মাঠের সবুজ আ’ল বেয়ে।
এক বুক সোনার শরম নিয়ে
বুকের রূপালী বোতাম এটে শুয়ে আছে নদী।
বুকের আসবাবে এইসব জমে জমে
গড়েছে শ্যামলী পলল।

তাকিয়ে দেখি কিছুটা নতুন-আকাশ
প্রায়ই জলপাই বনে এসে নামে।
কিছু পাখির স্বর সুর হ’য়ে
গোলাপী বৃষ্টির মত মাটিতে ঝরে।

মাঝে মাঝে ডানা খুলে নেমে আসে
নীল মেঘের মাতৃস্নেহ−আমার পূজারী হাতে।
আর স্বপ্নের ধান গুলো মাঠে বুনে
কৃষক হাসি তোলে মাটির সরল গালে।

তবু নতুন আকাশ জুড়ে প্রায়ই
একটি পাখির নিবেদিত কান্না,
কিশোরী বাতাস গুলে নেমে আসে নিথর মাঠে−

কে তবে কাঁদে ?
নন্দিনী কাঁদে না তো ?
তবে কান্নারা কেন আমার চোখে মাখায় নন্দিনী জল !

মেঘের অক্ষরে

মেঘের জানালায় পরম বিস্ময় ছিল।
একখানি লাজুক আকাশ নরম আঙুল তুলে
ইশারায় ডাকল আমায়।
তখনও আঙিনায় টুকরো শ্রাবণ ছিল ; মাটির নখে তুলতুলে জল।
নদীতে পলকহীন একটি আষাঢ় নিবু নিবু জেগে।
আমি নীল আলো প্রদীপ হাতে বাইরে এলাম।
দেখি মেঘের আকাশে নারীদের জল কথাগুলি ওড়ে।

একটি লাজ ঢাকা মেঘ-ওড়না
ময়ূরের মত উড়ে উড়ে সরল জোস্না মাখে।
কুমারী লেবুর মত সবুজ কোমল প্রেম তার
লিখে রাখে মেঘে−মেঘের অরে।

কুমকুমের মত স্বচ্ছ সদয় ইচ্ছে তার
আকাশ আলোয় করে টলমল,
তার কোমর ত্বকের নীচের নারী জোস্না
পৃথিবীর প্রেমিক পরাণ−
ক্রমাগত নরমে খুন ক’রে যায়।

মেঘ-বরিষণ

তোমার ঠোঁটের যমজ উষ্ণতা
কাজল লেপে শুইয়ে আছে ভুঁইয়ে।
পায়ে লাগে তাই নবান্নের তরুণ উৎসব।
হেমন্ত জড়ানো এই পথে আমি আবার তাই এসেছি ফিরে।

এইখানে সুকোমল মনের সাথে
আমার হৃদয় ক্রয়ের কথা হয়েছিল।
বর্ধিত আমন আজও সাী−সেও আজ অতি সুফলা।
তৃষ্ণার্ত মাটি নয়ন মেলে চেয়ে আছে
সেও তো চায় একাহারী নারীর হৃদয় !

কিন্তু হৃদয়ের শর্ত নয়নে মুছে ফেলে
কিছু কুহেলী গন্ধ আজ কেন দিগন্তে
সন্ধ্যার মত নীরবে হেঁটে চলে যায় !
সে কি তবে ভুলে গেছে হলুদ-হেমন্ত !
নির্জন রাঙা পথ! সেই কাজল কথা !

আজ তবে এই প্রান্তরের পাড় হতে
প্রশান্ত নদী নয়−এক হৃদয় অন্ধকার
আঁজলায় তুলে ফিরতে হবে বাড়ী ?
তবে আর বাড়ী ফেরা নয়−
আমি করুণ মেঘের কাছে যাব
নেব সন্ন্যাস−হব আজীবন-দুখিনী এক মেঘ-বরিষণ।

পলাশ ফুলের কাছে

এখন আকাল জানি−
তবুও পলাশ ফুলের কাছে চেয়েছি পবিত্র নগর।

চাঁদ ধুয়ে নেমে আসা রাত্রির পায়ের কাছে করে গেছি সজল প্রণাম।
রৌদ্র মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছি হৃদয়ের গাঢ় প্রার্থনা।
শিশির-সূর্য-ভোরে তারই কাছে চেয়েছি বিশুদ্ধ মানব।

মানুষের রঙে−মানুষের জন্যে ফুটে পড়া একটি পলাশ−
আমায় শুদ্ধ শক্তি দাও দু’হাত ভ’রে।
জাগাও আমার মানবে নব মন্দির−নতুন দেবতা কোনো।

দুয়ারে এসেছিল মধুমতি প্রেম−ওহ্ কি তার জ্বালা আমি বুঝি !
তারেও দেয়নি ছুঁতে এই প্রেমিক পুরুষ−দেয়নি পৌরুষ একবিন্দু।
বলেছি ফিরে যাও ঘরে−এই পথে পড়ে আছে কাদামাখা ভুল ;
এই যৌবন সঁপেছি পাখির লাল চঞ্চুতে তুলে রাখা−
পলাশ গাঁয়েরই রাঙা পলাশ পথে।

পলাশ সরণীতে তাই আমার নিয়ত বসত।
এ জীবন আমার−
মিনতির মত তাই সেখানেই বাঁধা পড়ে আছে।

নোট বুকের নীল সরণী

এক পশলা বকুল বৃষ্টির মত,
চোখের কয়েকটি রূপালি ফোটায়−
ভিজে গেল নোট বুকের নীল-সরণী।
যেখানে শব্দ-শরমে লেখা ছিল কিছু স্বর্ণ-কথা−
−ভালবাসি অপর্ণা সেন শুধু তোমাকেই ভালবাসি−

বিকালের পাতলা অভিমানের মত কথাগুলি ক্রমাগত
মরতে মরতে চুপ হয়ে গেল। বৃ বেয়ে পাতা রঙের হালকা হাওয়া
তখন উড়ে এসে ঘরে মিহি শোক ছড়ালো।
আর ঘর ছুঁয়ে দরজায় এঁটে গেল কষ্টের নীল-কারুকাজ।

কালো চুলে তুলে রাখা মোহন ব্যথা−
ঝর্ণার মত সুকোমল হৃদয় পেয়ে,
নত-বাঁধনে জড়ালো আমায়।
তাই অশ্র“ ছুঁয়ে বেঁচে আছি আজীবন, এভাবেই বেঁচে থাকা।

শুধু নোট বুকের নীল সরণী জুড়ে বকুল বৃষ্টিরা
আজো জল চোখে চেয়ে আছে, চেয়ে থাকে অধরা মাটির বুকে।
আর বুকের শিউলি পথে মাঝে মাঝেই
এক পশলা ঝরে পড়ার পরিণত সুযোগ খোঁজে।

Comments
One Response to “অজয় রায় এর কবিতা”
  1. Mushfiqul Haque Mukit says:

    চমৎকার সব কবিতা অনেক ভাল লাগল ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: