কবি মুস্তফা আনোয়ারকে নিয়ে লিখেছেন কবি কাজল শাহনেওয়াজ

কবি মুস্তফা আনোয়ার

১০ অক্টোবর, ১৯৪০ – ৬ এপ্রিল, ২০০৬

 

১.

কবি মুস্তফা আনোয়ার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অস্তিত্ববাদি চৈতন্য দিয়ে শুরু করেছিলেন কবিতা লেখা, নিম্নবর্গের পরাজিত মানুষের আর্তনাদ ধারণ করেছিলেন কণ্ঠস্বরে। তারুণ্য শক্তি দিয়ে নিজেকে আপাদমস্তক ব্যান্ডেজ করেছিলেন আর জীবনের শেষ পর্বে এসে ‘কি করি কোথায় যাই’ এর উত্তর খুঁজেছিলেন লালনের সৃষ্টিকর্ম ও জীবনাদর্শে।

তাঁর কৌতুহলি জীবন, জ্ঞানজিজ্ঞাসু আবিষ্কারক মন এবং চিরঅভিমানি ব্যাক্তিত্ব ছাপিয়ে সামনে এসে পড়েছিল একটাই পরিচয়: তিনি কবি!

যুদ্ধ ও পরাজয় – এই দুটি জাগতিক অমোঘ বিষয় ছিল তাঁর প্রধান আগ্রহের বিষয়। আর একটা অপ্রতিরোধ্য পাশবিক প্রেমানুভূতি ছিলো তাঁর সব চিন্তার চালিকা প্রেরণা।

প্রেম ছিল তাঁর দেশকে নিয়ে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করে নিজেকে বিপ্লবীর স্তরে নিয়ে গেছেন।

মেশিনগানের গুলির শব্দের ছন্দ কিভাবে কবিতায় ধারণ করা যায়? কারন, আপনি যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে কবিতা লিখবেন, আপনাকে উপলব্ধি করতে হবে গুলি, হত্যা, আগুন, লুটপাট, ধর্ষন, ধ্বংস। এ বদ্বীপের মানুষগুলি একটা আধূনিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে নতুন সময়ে প্রবেশ করছিল এই ছন্দের ভিতর দিয়ে। নতুন এই ছন্দকে ভাষায় আনার জন্য মুস্তফা আনোয়ার মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিলেন।

আমরা, আশির দশক পার হতে হতে, বুঝতে পারি কবিতার ছন্দের সেই শক্তি। শুধু মাত্র ফুসফুস ছন্দ দিয়ে সমকালীন কলোনী-উত্তর, আধূনিক-অন্ত, কাঠামো-উত্তর মনকে উপলব্ধি করা যায় না। অনেক কিছুরই পূনর্বিবেচনা প্রয়োজন। বিষয়ের গ্লোবাল রিয়েলিটির আগে চাই লোকাল রিয়েলিটি।

২.

অবশেষে লোকটা মথ থেকে প্রজাপতি হয়ে গেল। হ্যাঁ, এখন থেকে আমরা তাঁকে বলতে শুরু করব – লোকটা কবি ছিল। যদিও তাঁকে আমরা কলঙ্কিত করিনি কোনো ‘একাডেমী’ পুরস্কারে; ছাপিনি তার কোনো গদ্য/পদ্য পুস্তক নামকরা প্রকাশনী থেকে; এমনকি কোনো রাষ্ট্রিয় হৃদয় থেকেও তাঁকে ডেকে বলিনি, এসো কবি তুমি এসে আমাদের সঙ্গে একটু বসে যাও।

এ দেশে যারা সাহিত্যের ইতিহাস জানেন, তাদের মুখে মুখে ফেরে ‘স্বাক্ষর’ নামক একটা সাহিত্যপত্রের নাম। সেখানে ছাপ ছিল কবিতার নতুন থাবার। অনেকের লেখা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়, ওই সময় যারা কবিতার দিক বদলের চেষ্টা করছেন তাদের অল্প কয়েকজন মাত্র আজতক টিকে আছেন নিজের রচনায়; নিজে যেসব পথঘাট শুরু করেছেন সেসব পথঘাটসহ। বাকিরা ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে যথাস্থানে স্থান করে নিয়েছে, ইতিহাসবেত্তার তোয়াক্কা না করে, একাডেমি পুরস্কার কলঙ্কিত করে।

স্বাক্ষরের চতুর্থ সংখ্যায় মুস্তফা আনোয়ার একটা কবিতা ছাপেন। নাম ‘জ্যোৎস্নালোকে গোরস্থান’। (এখনও সদ্য তরুণ কবিও তার বিদ্রোহী পথের সূচনা করেন এই একই বিষয় নিয়েই, আশ্চর্য!)। কবিতাটির বিচার আমি করতে চাই না – এমনকি বক্ষ্যমাণ লেখার কোথাও আমি সে চেষ্টা কোনোভাবেই করতে চাই না আর এই লেখার উদ্দেশ্যও তা নয়। কবিতায় শেষ পঙক্তিগুলো ছিল : ‘… বান্ধবের অনঙ্গ প্রেতাত্মা / সর্বোচ্চ মিনার থেকে আমাকে ডাকছে তীক্ষ্ন স্বরে / মেঘের মুকুরে ওই অশ্বারূঢ় দেবতার হাত ভিন্ন করেই / হৃদপিণ্ড শয়তান নরকে পালালো।’

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তখন তরুণ কবিরা তাদের বিষয় খুঁজে নিতেন এই রকম মৃতু্য, বধ্যভূমি, গিলোটিন, ভাত দে… ইত্যাদি বিষয় থেকে (যা আজকাল আমরা মেনে নিয়েছি, স্বাভাবিকই মনে হয়)। প্রতিটা সময়ের একটা সাধারণ চরিত্র থাকে, থাকে কতগুলো সাধারণ শব্দ, সাধারণ বিষয়, ভঙ্গি, উপমা, পছন্দ…। প্রায় সব কবিই (প্রধান বা অপ্রধান) সেই রকম বিষয় নিয়ে লেখেন আর প্রধানত যারা ভবিষ্যতে কবি পরিচিতি পেয়ে যাবেন, তারাও ক্রমে সবার বিষয়গুলো নিজের বিষয় বলে চালিয়ে যান। অপ্রধান বনে যাওয়া কবিরা বিষয়টা টেরই পান না বলে ওদের কোন লক্ষণই নেই। ওরা শুধু অভিনয় করেই চলে। কিন্তু সমস্যা হয় মৌলিক কবিদের নিয়ে। তারা একাধারে কবি ও বৈজ্ঞানিক হিসেবে তৈরী হন, কিন্তু অভিনেতা হতে পারেন না। অভিনেতা কবিরা শর্টকাটে চলেন, ঝিলিক মারেন, একাডেমি পুরস্কার ইত্যাদি পেয়ে চলেন।

ষাটের দশকে যারা ‘গোরস্তান’ ইত্যাদি নিয়ে শুরু করেছিলেন, তারা দ্রুত অন্যত্র সরে পড়লেন। কিন্তু মুস্তফা আনোয়ার, শেষ বিচারে মনে হচ্ছে, কবিই ছিলেন। কারণ তার প্রায় ৭০ বছর পর্যন্ত তিনি তার কাব্য দর্শন, বোধ ও বিশ্বাস প্রায় একই লাইনে বেঁধে রেখেছেন। তিনি শয়তানকে পালাতে দেননি।

কবি হয়েও তার বৈজ্ঞানিক প্রবনতা ছিল প্রখর। যে জন্য তিনি তাঁর নিজের ভাষার গদ্যপদ্যের অসুখবিসুখ সহজে ধরতে পারতেন, তার নিদান দিয়েছিলেন চমৎকার করে। প্রায়ই লক্ষ্য করেছি, যে অনুভূতি প্রকাশ প্রয়োজন ছিল গদ্যে, তিনি তার কাব্যের উপমা দিয়ে গভীরতার টানেলেই কাজটা সেরে ফেলেছেন। আবার তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘রসাতল ও মরিয়ম’ হওয়া প্রয়োজন ছিল একটা ‘বৃহৎ অরণ্য’ বা ‘জরাথুস্ত্র বললেন’ বা ‘ইউলিসিস’ – আকারে ও ব্যাপ্তিতে, তা হয়নি। ব্যক্তি জীবনে তার চিন্তার প্রিয় উৎস ছিল ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’।

মিলিয়ে দেখি ‘মরিয়ম ও রসাতলে’ সেই কাজটাই কবিদের কবির মতো করেছেন তিনি।

কবিতার নাম: মরিয়ম (যিশু মাতা?)

কবিতাটা নাট্যধর্মী কিন্তু কোনো ড্রপসিন নেই শুরু বা সমাপ্তিতে।

চরিত্র: ইয়াসিন (সুরা ইয়াসিন দ্র.)

আবহসঙ্গীত: নাট্যধর্মিতা প্রমাণের জন্য বিভিন্ন নির্দেশ যেমন ‘বাইরে ঠেলা গাড়ির ক্যাচক্যাচ শব্দ / ফিসফিস কথাবার্তা / দুতিনজনের ঝগড়া’ বা ‘জার্নি টু দ্যা সি: হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া’।

‘মরিয়ম’ – এর সমাপ্তি এ রকম:

‘চাঁদ নষ্ট হয়ে গেছে। কালো মেঘের ওপার থেকে ঝরে

পড়ে লাস্ট পোস্টের সুর – ধীরে ধীরে সমস্ত চরাচর অধিকার করে

নেয় সেই একটানা বিশাদঘন বীরোচিত বিদায়ের সম্মানিত সুর।

প্রসঙ্গত বলা যায়, মুস্তফা আনোয়ার ছিলেন সেই দশজনের একজন, যারা ইতিহাসের একটি সুযোগ পেয়েছিলেন, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ নামক এ উপমহাদেশের একমাত্র ‘যুদ্ধকালীন রেডিও’ চালানোর। ওয়ার রেডিও’র শব্দ সৈনিক।

আমার সঙ্গে তার পরিচয় ২৫ বছরের বেশি। কিন্তু এই একটি বিষয়ে তাকে পাঁচবারও বলাতে পারিনি – ব্যক্তিগতভাবে। বহুবার বলেছি, লিখুন না। হাসতে হাসতে বলত – কী হবে লিখে। একটা লোককে ধরে এনে এনাউন্স করতে দিলাম, পরে দেখি সে হয়ে গেল বীর, আমরা বা…। আবার যার নামে দশ মাস গর্ভযন্ত্রণা ও স্বাধীনতার সৃজনসুখ – তাদের কারও সময় হলো না আমাদের নিয়ে এক কাপ চা খাওয়ার। কী হবে আর স্মৃতি চর্চা করে, আনন্দের স্মৃতিও সর্বদা চারণ করবার নয়।

এককথায় বলতে গেলে মুস্তফা আনোয়ারকে বলা যায়, ‘কালো রবীন্দ্রনাথ’। সম্রাট শাহজাহান যেমন ‘কালো তাজ’ বানাতে চেয়েছিলেন, মুস্তফা আনোয়ার, সে রকমই আকণ্ঠ ডুবে ছিলেন কালো রবীন্দ্রনাথে। সারা জীবন শুধু কালোর চর্চা করেছেন। কালো – তবে বদলেরীয় কালো নয়, তা একেবারে রাবীন্দ্রিক কালোত্ব। যে কালোত্বের জন্ম হয় দেশের ইতিহাস চু্যতি হলে, ব্যক্তির ইতরপনা বৃদ্ধি পেলে।

চিরতরুণ মুস্তফা ৭০ বছর পর্যন্ত জীবনের গুণগান গেয়ে গেলেন – এ এক পরম বিস্ময় আমার কাছে! আর আমরা কি না তাঁকে ফেরত দিলাম উপেক্ষা – তাঁকে ঠিকমতো পড়লাম না এক পঙক্তি – চাইলাম না বুঝতে কেন এই একজন কবি জীবনের সব সত্য বাধা রাখে তার কবিতার কাছে।

ও মুখ কি স্বর্গের আমি ছোঁব না তবে

ও ঠোঁট কি স্মৃতির আমি খাব না চুমু

ও দেহ কি মন্দির আমি দেব না পূজা

ও ধুলো কি পবিত্র আমি নেব না হাতে

ও মন কি রংধনু আমি চাই না কিছু

ও আত্মা কি অগি্নর আমি নেভাব দীপ।

পরিসংখ্যাণ বলে দেয় লেখাটাকে তিনি খুব একটা প্রকাশযোগ্য মনে করেননি। শুধু ভালবেসেছেন, বোকার মত, অন্ধের মত, কবির মত।

তার কবিতাগুলো পড়তে গেলে মনে হয় গদ্যগুলোও পড়া দরকার। আর গদ্যের মাজেজা বুঝতে গেলে কবিতায় ডুব দিতে হয়। বেশ একটা পাজল গেম। তিন দাড়িঅলাকে বেশ মানতেন। ভাবতেন এই তিনজনেই বর্তমান সভ্যতার জনক (মার্কস, আইনস্টাইন, ফ্রয়েড) ও সংকট। তবে আমার সঙ্গে তার এ বিষয়ে অনেকদিন বহু শ্রমঘন্টা ধরে বামচারী যুদ্ধ হয়েছে – অনেক রকম ঘাম ও রক্তের বিনিময় ঘটেছে – কেননা আমরা দুজনের কেউই দাড়ি রাখাটাকে পছন্দ করিনি। এমনকি প্রতিদিন আর কিছু না হোক একবার করে এই দাড়ির অস্তিত্ব কিভাবে সংকটে ফেলা যায় – এমনকি ধ্বংশ করা যায়, সে চেষ্টা করেছি।

হায়, সেই চেষ্টায় আর তাকে পাব না।

মুস্তফা আনোয়ারের সঙ্গে আমার সাক্ষাত ঘটে কবি আবিদ আজাদের মাধ্যমে ১৯৮০-৮১তে। প্রথম দর্শনেই তার আইনস্টাইন ধাঁচের খোমা (ঢাকার রাস্তার ভাষায় ‘চেহারার’ ডাক নাম) আমাকে আকৃষ্ট করে – তাই সন্ধ্যার কিছুটা পরে তার নেতৃত্বে যখন আমরা চারজন (+রিফাত চৌধুরী) চৌদ্দটুলি নামক ধাঙর পল্লীর দিকে যাচ্ছিলাম, আমি প্রায় সম্মোহিত ছিলাম অর্থাৎ উনি আমাকে দিয়ে সে সন্ধ্যায় যে কোন কাজ করিয়ে নিতে পারতেন আরকি। আমি সে সময় খুব লাজুক প্রকৃতির এক পড়ুয়া গোছের কবি রসোপ্রার্থী। চৌদ্দটুলির অল্প আলোতে ধাঙর বৃদ্ধদের মাতলামোর চাইতে আমার কাছে মধ্যবয়সী মা শুয়োর ও তাদের ছানাপোনাদের খেলাধুলাই বেশি মজা লাগছিলো। যেহেতু আমি দোচোয়ানির গন্ধ সহ্য করতে পারিনি জীবনে কোনদিনই, তাই বসে বসে সস্তা বট (গরুর নাড়িভুড়ি) কাবাব চিবাচ্ছিলাম। একসময় সেই ক্ষণ এল – মানে, মু. আনো. মাতাল হলেন, আমাকে ‘ভদ্রলোকের বাচ্চা’ বলে গলি দিতে লাগলেন – বারবার বলতে লাগলেন ‘ভদ্দরনোক হয়েচিস – অ্যাঁ দিনের বেলা দ্রাবির হইস, আর রাইতের বেলা ভদ্দরনোক – জুতিয়ে মুতিয়ে ছাড়ব – শ্লা ভদ্দর নোক।’

ব্যাপারটা আমার কাছে জটিল বলে মনে হচ্ছিল। ঘটনাটা কী? কয়েকদিন পর দেখা হলে দেখি খুব লজ্জিতভাবে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। যেন পানের পর যা বলেছেন তাতে আমি মনে করেছি কিছু। মনে মনে ঠিক করলাম তার এই আড়ষ্টতাটা কাটাতে হবে। সন্ধ্যা হলো। তখন আড্ডা হতো আবিদ ভাইয়ের শিল্পতরু প্রেসে, নবাবগঞ্জ। দেখি রাত নেমে আসছে। কিন্তু মু. আনো.র কোনো নড়াচড়া নেই। কী ব্যাপার? ব্যাপার আর কি, সেদিনের ঘটনার পর প্রতিজ্ঞা করেছেন ও মুখো হবেন না। কিন্তু আমার তো জানতে হবে ব্যাপারটা কী! ‘ঠিক আছে আমার জন্য চলেন।’ আবার অন্ধকার, শুয়োরের ঘোৎ ঘোৎ। বয়স্ক ঘাম চকচকে ধাঙর বৃদ্ধ। মু. আনো. প্রতিজ্ঞা করেছেন নিজের পয়সায় খাবেন না। তাই অকাতরে আমাকে ধার দিয়ে যেতে লাগলেন। আমিও কাবাবের ফাঁকে দু-এক চুমুক…।

হঠাৎ বললেন : একে চেন (ধাঙর বৃদ্ধকে দেখিয়ে)।

আমি বলি : না তো। চিনবো কেনো?

মু. আনো. : হা হা হা! ভাইডি, এই তো ধরা খেইয়েচো। অনার্য চেনো। দ্রাবিড় চেনো – কিন্তু নিজের পূর্বপুরুষদের চেনো না।

এই বদ্বীপের মানুষগুলি কারা? কোত্থেকে এইলো সব? এরা সব আশপাশের পলাতক পরাজিত জন। এই নদীর ফাঁকে ফাঁকে পালানো দাবার খাওয়া লোক সব। এই যে দেখছো ধাঙর, এ-ই হয়তো আমাদের ফেলে আসা কয়েক শ বছর আগের পূর্বপুরুষ।

এই দেশটা একটা মুখোশ। এই দেশটা একটা লাশ। এই দেশটা একটা গণহত্যা। একটা চিতা। এই দেশটা একটা ভোজবাজি। আর্য-অনার্য শোষণ। এই দেশের ধর্ম সেমিটিক না – এখানে ওল্ড থেকে নিউ টেস্টামেন্টের রূপান্তর ঘটেনি – এখানে ‘আইনের রাজ্য থেকে বিশ্বাসের রাজ্য আসেনি’ – বিশ্বাসটাকেই আইন বলে চালিয়ে দিয়েছে।

কবি মুস্তফা আনোয়ার রবীন্দ্রনাথকে বানিয়েছিলেন তার কবিতার বিষয় – এও এক বিস্ময়কর কায়দা। রবীন্দ্রনাথ জীবনদেবতাকে – তার দার্শনিক প্রতীতিতে, যেমন করেছেন লালন সাঁই-য়ের পড়শি খোঁজ – আমার বারবার মনে হয়, মুস্তফা আনোয়ারের সে রকম একটা সচেতন চেষ্টা ছিল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। যাকে আমি বলতে চাই ‘কালো রবীন্দ্রনাথ’ অর্থাৎ একটা বিপরীত রবি কাজ করেছে তার চিন্তায় – কখনো মুখোমুখি, যুদ্ধরত, কখনো দর্শননির্ভর, তর্করত, কখনো শান্ত, প্রেমপটানো। আবার হিংস্র সমর্্পকও দেখি। আসলে বিংশ শতাব্দীর যে কোন বাঙালি শিক্ষিত মানুষ অনেকটাই রবীন্দ্রনাথজাত – তাতে দ্বিমত নেই। আর যে সময়টায় মু.আনো.র মনোস্ফুটন অর্থাৎ ষাটের দশক – সেটা তো ফাটাফাটি সময় রবীন্দ্র প্রেমে রবীন্দ্র পূজায়। তাঁর রবীন্দ্রঅনুসন্ধান আর আত্মসৃজনশীলতা একাকার হয়ে গেছে। তাই তো দেখি কবিতা পুস্তকের নাম ‘কোন ডাকঘর নেই’ (কারণ কবি মু.আনো. কিশোর অমলকে তার একটা পকেটে সর্বদা রেখে দিতেন)।

কবি মুস্তফা আনোয়ার বিজ্ঞানস্পৃষ্ট, বিশেষ করে গাণিতিক যুক্তি প্রভাবিত ছিলেন। এ ব্যাপারটা টের পাওয়া যায় তার অনেকগুলো লিরিকধর্মী কবিতায় – যা কিনা রবীন্দ্রনাথের কোনো না কোনো চরিত্রের অংশবিশেষ। আর এই অংশায়ণ ঠিক দা দিয়ে কসাইয়ের মতো চপাৎ করে কাটা নয়, বরং তা কোনো কবিতার মাইক্রোপ্রসেসরের ভেতর থেকে একটা বিশেষ প্যানালজিক গেট খুলে দেয়া – যা কিনা মনের ভেতরকার একটা আকুলিবিকুলিকে পুরাটাই ডিজিটাইজড করে।

মু. আনো. আরেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত মৌলিক অনুসন্ধানী ছিলেন – তা হলো তার ছন্দ অভীপ্সা। কেমন করে যেন লিরিকগুলি খুলে দিত তার মনের ভেতরকার চিচিৎকার – নানা রকম শব্দবন্ধ ও শব্দযোজন মিলেঝিলে ঠিক জিনিসটা স্পর্শ করে ফেলত। এমন হয় তার পঙক্তি বিন্যাস, যে, ঠিক রসটাই সে বের করে ফেলে। সেই কবিতাটার কথা মনে পড়ল, যেখানে দয়িতাকে (নাকি দয়িতকে) এত কাছে রেখে দেব বলে ভাবছে – সবকিছুসহ – যেভাবে খুন করে লাশটাকে সেপটিক ট্যাঙ্কের ভেতর রেখে দেয় খুনি – যাতে তার কোনো কিছুই প্রকাশ হয়ে না পড়ে, শুধু সে ছাড়া আর কেউ না জানে সে কোথায়! আহা!

মু. আনো. আবিষ্কার করেছিলেন ছন্দের আর্য, অনার্য রূপ। শুধু রূপকল্প, উপমা… ইত্যাদিই কবিতার বিচার্য নয়। এগুলো কৃত্রিম। আরোপিত। বাংলা লৌকিক ছড়ার ছন্দে তার বিশ্বাস ছিলো গভীর। কি একটা রহস্যময় পদ্ধতিতে তিনি তা ব্যবহার করেছিলেন তার কবিতায়।

তিনি আমাকে একটা রহস্যের কথা বলেছিলেন, বাংলা ভাষার দুই প্রধান কবি একই সঙ্গে ছান্দসিকও – তারা সারাজীবন মূলত একই ছন্দরূপে কবিতা লিখেছিলেন কেন? জীবনানন্দ দাশ ও বিনয় মজুমদার দুজনেই কেন বাংলা ভাষার দীর্ঘতম পয়ার পঙক্তিগুলো লিখেছিলেন?

তিনি হঠাৎ একদিন খুব উত্তেজিত ও চক্রান্তকারী ভঙ্গিতে বললেন: তোমরা কি জানো তোমাদের কবিতার (রিফাত ও আমার কবিতা) একটা রহস্য আমি ভেদ করেছি! আমি তো অবাক? বলে কি? বললাম : বলেন কী বুড্ডা জীন! কোন দিন তো এ ব্যাপারে কিছু বলেন নাই। জানি আমাদের পছন্দ করেন। কিন্তু আমাদের কবিতা কেমন, তাতো বলেন নাই। বলেন: শোন, তোমাদের ছন্দ আমি ধরতে পেরেছি। তোমরা একটা বিশেষ কায়দায় লেখ, হঠাৎ এর কৌশল বোঝা যায় না। এ একেবারে অন্য রকম, একেবারে আলাদা, নতুন। বলে সত্যি সত্যি মু.আনো. কখনো যা করেন না, আমাকে একটা হাগ দিলেন।

কিন্তু বললেন না কী সেই রহস্য ভেদ? কী সেই কায়দা কৌশল? শুধু মুখের কোনে ঝুলিয়ে রাখলেন তার সেই আইনস্টাইনিয় হাসি। বুঝলাম আমাকেই বুঝে নিতে হবে যা বোঝার। কবিতা শুধু একটা জীবন দিয়েই বুঝতে হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: