অনুপম চৌধুরীর গল্প নীল আকাশে ভাসমান মেঘ

English: Chittagong bypass connecting the Chit...

Image via Wikipedia

 

কলেজ থেকে ফিরেই কেমন জানি আনমনা খারাপ লাগা চেপে বসল । দুপুরে খেতে বসেও খাওয়া হল না । রিমোট চেপে কোন চ্যানেলও  মন বসাতে পারছে না । তাই কম্পিউটার খুলে বসে পড়ল ফেইসবুকে । এখন আগের মতো ভাল লাগে না ফেইসবুক । একটা বিতৃষ্ণা থেকে, বসা হয়ে উঠে না । তারপরও নাই মামার চেয়ে কানা মামার স্টাইলটা গ্রহণে করত হল । বাহিরের আবহাওয়াও তেমন সুবিধের না । পুরো আকাশ যেন মুখ ভার করে বসে আছে । মনে হচ্ছে একটু পর ধমক খাওয়া বালকের মতো অঝোরে কেঁদে ফেলবে । বাইরের অবস্থানের সাথে ছোট ভলিউমে বেজে চলল রবীন্দ্র-

“আজি ঝর ঝর মুখর বাদর দিনে

জানিনে জানিনে কিছুতেই কেন যে মন লাগে না “

 এরি মাঝে ফেইসবুক ওয়ালে চোখ পড়তেই দেখল ৬৫ টি নোটিফিকেশন, ৫ টা ম্যাসেজ ও ৩ টা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট ।আগে ঘুরে আসল ম্যাসেজ বক্স হতে , রাশেদ , চুমকি, সাথী , থিতি ও অপরিচিত এক ছেলের ম্যসেজ । অনেক উৎসাহ নিয়ে আগে ওই ম্যসেজ দেখল , তাতে লিখা – “আমার খুবি মন খারাপ, তাই তোমার সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য হাত বাড়ালাম, যদি তোমার হাতের স্পর্শ পায় তবে ভাল লাগবে । ভাল লাগার উৎসবে মুখর হউক তোমার প্রতিটি ক্ষণ “। অনেক ভাবল “তাথৈ” । কি করবে বুঝে উঠতে পারছিলনা । অবশ্যই অপরিচিত রিকুয়েস্ট সে গ্রহণ করে না । আজ তার মন খারাপ।এর মাঝে ওই ছেলেটার আকুতিটা ও আরও মন খারাপ করে দিল । তাই কিছু না ভেবে কনফার্ম বাটনে চাপ দিল, সাথে সাথে  খুলে গেল নতুন বন্ধুর পুরো আকাশ । এভাবে অনেক উৎসাহে দেখতে লাগল ইনফো, ফটো, সবি … । কিন্তু কোথাও কোন ছেলের ছবি দেখল না , আর দেখলেও একটার সঙে আরেকটা মিলল না । দেখল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে  বাংলা বিষয়ে অনার্স পড়ছে । একি! জাইগার ছেলে দেখছি । তারপর দেখল পুরো ওয়াল জুড়ে ছোট ছোট স্ট্যাটাস , বেশ মজারও , বেশীর ভাগ কবিতার লাইন –  

“যাপিত জীবন কলা         মধুর বাসনা ডালা

    খেয়ালিপনায় বাজে জাদুর বাঁশি,

স্বর্গ ফেরত মায়া           লেপটে যাওয়া কায়া

    নরম বালিশে গুঁজে মায়াময় হাসি”।

বুঝতে কষ্ট হলেও বেশ মজা পাচ্ছিলো । কার লিখা বুঝে উঠতে পারছিল না , তবে এই লাইন গুলুও যে, সে আগে পড়ে নি তা কিন্তু কনফার্ম । হঠাৎ গানের ফাঁকে শুনল ম্যেসেজের আওয়াজ  । একি! নতুন বন্ধু “নীল আকাশের” ম্যসেজ । ক্লিক করতেই দেখল, বন্ধুতের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন ।

নীল আকাশে অধরা মেঘ কেমন লাগল বলতো ?

আসলে তাথৈ’র প্রোফাইল নেইম ” অধরা মেঘ” । তাই এমনটি লিখল বন্ধুটি । অনেক ভাবার মিছিল শেষে জবাব দিল – হুম, ভাল ।

নীল- কেমন আছ বন্ধু ?

অধরা- ভালো, তুমি ?

নীল- এইতো ভাসমান মেঘ যেমনটি থাকে, উড়ছে উড়ছে । আর খানিক বাদে কেঁদে হালকা হবে এমটি ।

অধরা- এই যা ! তুমি করে বললাম । ডোন্ট মাইন্ড ।

নীল- ইট’স ওকে বন্ধু , আমরা প্রায় সমবয়সী , কোন সমস্যা নাই ।

এভাবে কথা চলল অনেকখানি ।  তখন গোধূলি বেলার ক্লান্ত সোনালি আভা উঁকি দিল তাথৈ’র জানালায়  ।

কেমন জানি এক পশলা বৃষ্টির মতো মেঘ সরে দেখা মেলল সুখপক্ষীর ।

একই ভাবে চলতে লাগল দিনের পর দিন ,বাড়তে লাগল তাদের বন্ধুতের ঘনত্ব । দিনে দু’তিন ঘণ্টা চলে ভাবের আদান-প্রদান ।এই ভাবে কেটে গেল প্রায় ৩/৪ মাস । একদিন অধরা(তাথৈ) জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা তোমার প্রোফাইল পিক কই ?

নীল- পিক দিয়ে কি হবে ?

অধরা- কি হবে মানে ?

নীল- একটা মানুষের গুণ হল সবকিছু , চেহেরাতে কি এসে যায় ।

অধরা- হুম, তা ঠিক , তারপরও একটা মানুষকে চিনার প্রধান উপায় তার চেহেরা ।

নীল- আমাকে দেখার কিছু নাই , আমি খুব বিশ্রী, কালা , তাই ছবি আপলোড করি না । হা হা হা হা হা ।

অধরা – হাসছ কেন ?

নীল- এমনিতে, একটা কথা উত্তর দাও, তোমার আসল নাম কি ?

অধরা- না, বলব না । কেন “অধরা মেঘ” সুন্দর নয় কি ?

নীল- তা কেন হবে , অনেক সুন্দর নাম । না , আসলে আমার  নাম অনিন্দ্য চৌধুরী ।তাই বলা ?

অধরা – হুম, দেখলা , ক্যামনে আসল নাম বেরিয়ে এল । হা হা হা হা হা হা । আমার নাম তাথৈ রায়  ।

নীল- অনেক সুন্দর নাম ।

অধরা- ধন্যবাদ , তোমার নামটাও অনেক সুন্দর ।  

এরি মাঝে তাদের সেল নাম্বার দেয়া , ভালবাসি বলা সবি হল , শুধু দেখাটায় বাকি ছিল । তাথৈ কে অনিন্দ্য দেখেছে , কিন্তু তাথৈ অনিন্দকে দেখে নি । তাথৈ কিন্তু দেখতে বেশ!  পড়ে চট্টগ্রাম কলেজ সেকেন্ড ইয়ারে । অনিন্দ্য তাথৈ’ কে দেখে আর তাথৈ না দেখে, তার গুণ কে অনেক ভালবেসে ফেলেছে । একটা সুন্দর সময় দেখে তাদের দেখা হওয়ার সিধান্ত হয় । সামনে ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি ভালবাসা দিবসে তারা দেখা করার সময় ঠিক করল । সেদিন মুসলিম হলে ছবি দেখার পরে দেখা করবে বলে ঠিক হল । খানিক আড্ডা দিয়ে ফুস্কা খেয়ে বাড়ি ফিরবে । ১৩ ফেব্রুয়ারি এপাশ – ওপাশ করেও ঘুম হল না কারোই । রাতে ফোনে চলল অনেক কাহিনী । আমাকে দেখে কি করবে , আমায় যদি পছন্দ না হয় , এই রকম অনেক কথা ।

সকাল হল, দুপুরে ২ টার টিকেট নিল তাথৈ । এদিকে অনিন্দ্যর সেল ফোনে সংযোগ দেওয়া যাচ্ছিল না , এমনিতেই মাথা খারাপ । তার উপর নাম্বার বন্ধ। যাক এই ভেবে তাথৈ ছবি দেখতে ঢুকে পড়ল । অনিন্দ্য ১০ মিনিট পর টিকিট কেটে কোন মতো আবছা আলোতে একটা সিটে গিয়ে বসে পড়ল । অন্ধকারে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না সিট গুলো । তারপরও কোনমতে বসে গেল, আলো-আধারি মায়ায় সবার দৃষ্টি তখন মুভি স্ক্রিনে,চলছে “রোমিও-জুলিয়েট” । হঠাৎ চেয়ারের হাতলে হাত রাখতে স্পর্শ হল পেলব এক হাত । বড় কাটের চুড়িও , সরি বলে কোন মতে হাত সরিয়ে নিল ।

তাথৈ অনেক বার ফোনে ট্রাই করেও ব্যর্থ হল । মাথা খারাপ এমনিতেই , তার উপর দু’পাশে দুটা ছেলে । মনে মনে শপদ নিল ,আর কখনো ওই ব্যায়াদবের সাথে কথা বলবে না।

হঠাৎ বিরতি আসায় হলের আলো জ্বেলে উঠল। অনিন্দ্য আস পাশের বসা মুখ গুলতে খুঁজতে লাগল তাথৈ’কে । অনেক খোঁজা পরে পাশে বসা , মেয়েটির মুখে চোখ পড়তেই চমকে উঠল অনিন্দ্য । তার পাশেই বসা তাথৈ । আবার নিভে গেল হলের আলো । শুরু হল পুনরায় মুভি । এবার আলো আধারিতে নিজের সেল ফোন বের করে খুদে বার্তা পাঠাল তাথৈ’ র সেলে । তাথৈ বুঝতে পেরে নিজের ফোনে চোখ দিতেই দেখল – “কেমন দেখছ মুভি, একা একা, পাশে আমি হলে বেশ মজা হত, তাই না ? এই ম্যসেজ দেখে তাথৈ নিজের সেল ফোন অফ করে দিল । মুভি স্ক্রিনে  চলছে রোম্যান্টিক দৃশ্য । এবার অনিন্দ্য ইচ্ছে করে , তাথৈ’র হাতে হাত রাখল । সঙে সঙে তাথৈ তেলে বেগুনে জ্বলে, বলে উঠল- ষ্টুপিড ! মেয়ে দেখলেই গা ঘেষতে ইচ্ছে করে না ?   

অনিন্দ্য- হ্যাঁ , তাই মনে হয় । আসলে তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে হলেত কথাই নেই ।  

তাথৈ এবার চিৎকার দিবে ভাবল ,সাথে সাথে মুখ চেপে ধরল অনিন্দ্য । এবং বলল , নীল আকাশে ভাসমান মেঘটা আজ বড্ড রাগল , বা!! রাগলে তোমায় অনেক মিষ্টি লাগে । একটা পিঙ্ক কালারে গোলাপ বের করে বলল – ভাসমান মেঘের এই ক্ষুদ্র উপহার , সাথে অফুরান ভালবাসা তোমার জন্য । 

Comments
2 Responses to “অনুপম চৌধুরীর গল্প নীল আকাশে ভাসমান মেঘ”
  1. aparajita1971 says:

    অনেক ভাল লাগল।

  2. bcbldev@yahoo.com says:

    ভালো

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: