বচন নকরেকের বই নিয়ে নির্ঝর নৈঃশব্দ্য: আবারও ইচ্ছেপাহাড়ের সুন্দরতায় ডুবে যাওয়া


ইচ্ছেপাহাড়ের মেয়ে। এটি নব্বই দশকের কবি বচন নকরেক এর তৃতীয় কবিতার বই। তার দ্বিতীয় কবিতার বই ইচ্ছেবন ইচ্ছেপাহাড়ের পরে আমরা পেয়ে যাই ইচ্ছেপাহাড়ের মেয়ে বইটি। বইটি প্রকাশিত হয়েছে মহান একুশে বইমেলা ২০১২ এ। প্রকাশ করেছে কবি মিঠুন রাকসামের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থকবিরিম। প্রচ্ছদ করেছি আমি, মানে এই বই আলোচনার লেখক। তিনফর্মা বইয়ের দাম রাখা হয়েছে ৮০ টাকা মাত্র। এই বইটাতে আমরা ৩৯টি স্বপ্নময় কবিতা পড়ার সুযোগ পাই। বইটি কবি উৎসর্গ করেছেন প্রথম মান্দি বিশপ ফাদার পল পনেন কুবি সি.এস.সি কে।

কবি বচন নকরেক যে সবসময় কবিতার ভিতরেই ডুবে আছেন তা তার কবিতাগুলি পড়লেই আমরা জানতে পারি। প্রিয়তম জন ছেড়ে চলে গেলে কবি যেনো নিজের ছায়ার কাছে সব বলে দেন চুনিয়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে। কবি বলছেন,

‘সব বলে দেবো এই ফকফকা জোছনার আলোয় দাঁড়িয়ে…’ (আমার পাশটি ঘেষে, পৃষ্ঠা ১১)

‘অন্ধকারের জ্যোতি হয়ে কোমল আলো ছড়াও…’
(দুটি মিনতি, পৃষ্ঠা ১৪)

এ আগুনের প্রতি কবির প্রার্থনা। মানুষের কাছে আগুন যখন প্রথম আসে আলো হয়েই আসে। পরে মানুষই তাকে সর্বভূক করে তোলে আপন খেয়ালে অথবা স্বার্থে। মানুষ এমনই। তারপরও আলোর আদি উৎস আগুনÑ সেটা সূর্যের হোক, বা বজ্রের হোক- আগুন আগুনই। সেই আগুনের কাছেই কবির সকরুণ মিনতি করছেন এই কবিÑ যিনি পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন। আর পুড়তে চান না। চান আলোকিত হতে। কবি ঝড়োবৃষ্টির কাছেই একই প্রার্থনা করছেন,

‘ওগো ঝড়োবৃষ্টি, শান্তিবারি হয়ে সুশীতল অমৃতজল ছিটাও এবার জ্বলে যাওয়া বুকটা জুড়াক।
(দুটি মিনতি, পৃষ্ঠা ১৪)

সময় পাল্টে গেছে। হারিয়ে গেছে সোনালিদিনগুলি, হারিয়ে গেছে বনের প্রকৃতি, এথনিক আচার। কবি লিখছেন শোকগাথা, ‘এ গ্রামে একদা জ্যোৎস্নারাত ভেঙে ভেঙে চষে বেড়াতো বুনো শুয়োরের পাল। বিশ্বাস হয় তোমার!’
(এথনিক গ্রামে সন্ধ্যা, পৃষ্ঠা ২০)।

কবি যেনো নিজের কাছেই প্রশ্ন করছেন, জুমেেত ছুটে চলা মানুষগুলি এখন কোথায়? কবি বলছেন,
‘বাড়ির জাংলায় শালিক বনমোরগ
ঘুঘুচরা উঠোনে ময়ূর নাচতো
মরিচপাকার মৌসুমে…
(কোথায় আমার ইচ্ছেবন ইচ্ছেপাহাড়, পৃষ্ঠা, ৩২)।
সব হারিয়ে গেছে যাকিছু শৈশবে কবির স্মৃতিতে ছিলো।

একটি বুড়ো শালিকের জন্যেও কবির মন কেঁদে উঠে, তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করেÑ যে শালিক এ ঠ্যাংঅলা বিদ্যুতের খুঁটিতে বসে ঝিমোয়। কবি বলছেন,
‘আমার মায়া হলো ওকে একা এভাবে বসে থাকতে দেখে
কাছে গিয়ে কুশল জিজ্ঞাসা করবো আলাপ-সালাপ
করবো বলে আস্তে আস্তে এগিয়ে যেতে থাকলাম…’
(বুড়ো একটা শালিক, পৃষ্ঠা ১৫)।

কবি বলছেন,

‘বিস্তীর্ণ ঘাসের জমিনে কবিতার ঘোড়ারা লেজ নাড়ে,
জাবর কাটে।
নীলাকাশ থেকে অন্ধকার ভেঙে নামে আলোর জামাপরা পরী, বলে এতোদিনেও মনে রেখেছো?’
(স্মৃতি, পৃষ্ঠা ২৪)।
এমন স্বপ্নময় স্মৃতি এ কবির লেখার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। এ যেনো জীবনানন্দের সেই মহীনের ঘোড়াগুলি। কবি বড়ই স্মৃতি কাতরÑ যাদুবাস্তব কল্পদৃশ্যে কবি ফিরে যেতে চান সোনালি শৈশব, সমৃদ্ধ অতীতে। কবি বলছেন,
‘উড়তে পারা মহীনের ঘোড়ায় করে
আবার যখন ফিরে আসি
সোনায় মোড়া বাক্সে আমার শৈশব শিশুকাল…’
(আদি ভৌতিক, পৃষ্ঠা ৪৭)।

কবি বলছেন,
‘দলিত ঘাসে ধর্ষিত নারীর রক্ত
নিতাই কোচের বোন বিবস্ত্র ভাসছে কংশ জলে একাত্তরে…/ দেশটা আমারও…

এই দেশটার জন্যে রক্ত আমরাও দিছি…’
(পাতা পোড়ার কাব্য, পৃষ্ঠা ৪০)।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে আদিবাসী জনগোষ্ঠির অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগ অনস্বীকার্য। তারপরও এই স্বাধীনদেশে তারা দলিত, গৃহহীন, ভূমিহীন। আমাদের প্রতিনিধিরা জাতিসংঘে গিয়ে বসে আসে এইখানে কোনো আদিবাসী নেই। কবি বলছেন,

‘আমরা উপজাতি নই, ুদ্র নৃ-গোষ্ঠি নই, আমরা আদিবাসী।’ (আদিমানুষের উত্তরাধিকারেরা, পৃষ্ঠা ৪৮)।

কেবল বাঙলাদেশে নয়Ñ সারাপৃথিবীতেই আদিবাসীরা নিপীড়িত, নিগৃহীত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত এবং শোষিত। এই আগ্রাসনের কথা কবীর সুমনের গানের ভিতরও শুনি। তিনি গাইছেন,
‘আদিবাসীদের ধর্ষণ করা যায়
… মারা যায় লাথি…’

সেই আদিবাসীদের প্রতিনিধি কবি বচন নকরেক। যার পরিচয় তার লেখার পরতে পরতে মেলে, আনন্দ, স্বপ্ন, ভূমি ও প্রিয়তম স্বজন হারানোর বেদনা হয়ে। বচন জাতিতে মান্দি, ভদ্রলোকেরা যাদের গারো বলে ডাকে। বচনের কবিতা পড়লেই স্বপ্নের ভিতর, কখনো বেদনার ভিতর ডুবে ডুবে ভেসে বেড়ানোর একটা ব্যাপার হয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: