রহমান জর্জির নাটক ওসিরিস

অ্যাবস্ট্রাক্ট
মৃত্যু দেবতা ওসিরিসের পুত্র শেয়ালমুখো তার পার্থিব সুন্দরী প্রেমিকা নেফ্রতিতির প্রতি প্রেম এবং কামভাবকে বাস্তবায়িত করতে তাকে মৃত্যু পূরীতে উঠিয়ে আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু দেব হস্তের কারণে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে সে তার পিতা মৃত্যুদেবের হস্তক্ষেপ কামনা করে। ওসিরিস দূত পাঠায় ফারাওকে বাধ্য করাতে যেন সে নেফ্রকে নিজের হাতে হাসিমুখে তুলে দেয়। তা না হলে দেশে মঙ্গা, খরা, অনাবৃষ্টি, মহামারি, দাঙ্গা দিয়ে নরক বানিয়ে দেয়া হবে। নেফ্রতিতির স্বামী ফারাওন  তাকে ভোলার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। ওদিকে দেবতাদের সাথে দ্বন্দ্বে যাওয়াটাও ভয়াবহ ব্যাপার। সম্রাট ফারাও’র রাজ-জৌতিষি এবং পুরোহিত একটি বিকল্প প্রস্তাবণা দেয়। দিশেহারা সম্রাট তাতেই সম্মতি দেয়। তারা আসল নেফ্রর কোন তৈরি করে এবং ওসিরিস দূত হেলিসের সঙ্গে মৃত্যুপূরীতে পাঠিয়ে দেয়। তন্ত্রের প্রভাবে মৃত্যুপূরীতে নকল এই মর্তের নেফ্র পার পেয়ে যায়। হেলিস তাকে শেয়ালমুখোর শয়ন শয্যায় হাজির করে। শেয়ালমুখো প্রচন্ড ভালবাসার দরুণ উন্মত্ত হয়ে পড়ে আর নিজের জীবন কবচটিকে দিয়ে নেফ্রকে সুরতি করে। এমন একটা বিষয় যে নেফ্রর সঙ্গে আর কেউ সম্ভোবগরত হলে সে এবং নেফ্র দু’জনেরই মৃত্যু ঘটবে। এদিকে একদিন দুর্গের পাশ দিয়ে যাবার পথে ওসিরিস তাকে দেখে আর রুপের মোহে সৌন্দর্যে কামুক হয়ে পড়েন। তিনি ভাগ্য দেবীর পরামর্শে ছদ্মরূপ নেন বিকল্প হিসেবে এক সময় কামের দুর্ভিক্ষে ভাসন্ত নেফ্রতিতি দেবী বেশি ওসিরিসের সাথে সম্ভোগরত হয় এবং পরিতৃপ্ত হয়। কিন্তু এর ফলেই শেয়ালমুখো এবং নেফ্রর যুগপৎ মৃত্যু ঘটে। আর ভালবাসা নয়। প্রচন্ড প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলে উঠে ওসিরিস; মৃত্যুর অধিপতি। মৃত্যু ঘটে মহাপ্রতাপশালী আর একজন প্রেমিক ফারাওনের। তার মৃত্যুতে যে মুকুটহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তারই ধারাবাহিকতায় পুরোহিত নিজেকে দেব আশীর্বাদ পুষ্ট বলে দাবি করে। এবং এক পর্যায়ে জৌতিষি সবার সম্মুখেই তাকে তলোয়াড় দিয়ে হত্যা করে। নিজেই সুকৌশলে জাকিয়ে বসে সে ফারাওর বিশাল সিংহাসন। কিন্তু রাজ্যে মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ আর হানাহানি লেগেই থাকে। এরই মধ্যে ব্যাবিলনিয় সৈন্যরা মিশর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। প্রস্তুতি নেয় ফ্যানিয়াস অর্থাৎ এই সম্রাট জৌতিষি এবং তার মন্ত্রণা সভাও। কিন্তু তার মৃত্যু ঘনিয়ে আসে ওসিরিসের তালিকায়। একটি স্বাভাবিক মৃত্যু। খোদ ওসিরিস তার জান নিয়ে যেতে শয়ন কে হাজির হয়। মৃত্যু ঘটে আরেকজন সম্রাটের। কোথাও কোন লাভ নেই। লোকসানও নেই। কেবল শূণ্যতা বিরাজ করতে থাকে…

চরিত্র
ওসিরিসঃ প্রাচীন মিশরীয় মৃত্যু দেবতা
শেয়ালমুখোঃ ওসিরিসের কনিষ্ঠ পুত্র
ফারাওন [৮ম]: খ্রীষ্ট পূর্ব ৩০০০ হাজার সময়ে মিশরীয় রাজা
নেফ্রতিতিঃ অনিন্দ্য সুন্দরী ফারাওন পত্নী
হেলিসঃ ওসিরিসের দূত (কাল্পনিক)
নেফ্রতিতি-২: নেফ্রতিতির নকল
ওসিরিস পুত্র-২ এবং ৩
ফারাও প্রেরিত যুবক -যুবতীবৃন্দ

টীকাঃ
সূর্যদেব রা’:
মিসরীয় প্রাচীন দেবতাদের মধ্যে আমন এবং রা’ অন্যতম। পরবর্তী সময়ে আমন-রা নামে হাইব্রিড দেবতা তৈরি হয়েছিল। আমন ছিলেন বাতাসের দেবতা অন্যদিকে রা’ ছিলেন সূর্যের দেবতা। একাদশ রাজবংশ থেকে দ্বাদশ রাজবংশের আমলে আমন রা’ প্রধান দেবতা হয়ে উঠে।

ওসিরিসঃ
তার কয়েকটি রূপ আছে। তিনি একাধারে শস্য দেবতা এবং মৃত্যু দেবতা রূপে পরিগণিত হতেন। সিংহাসনে আরোহনকারী ফারাওনদের মধ্যে সরাসরি দেবত্ব আরোপ করার চেস্টার মধ্য দিয়ে হোরাস নামক আরেকটি রুপের আবির্ভাব ঘটে। হোরাসকে ওসিরিস ও আইসিস দেবীর পুত্র হিসেবে দেখা গেলেও এর মধ্য দিয়ে পুনরুজ্জীবিত ওসিরিসের রূপায়ণও ঘটেছে। ওসিরিসের তিন পুত্র আছে বলে জানা যায়। ওসিরিসের পুরাণে নরখাদকবৃত্তির কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘আতেন’ রূপে আখেনাতেনের আমলে তার মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

দৃশ্য-১
[ফারাওনের অন্দরমহল]
[দুঃস্বপ্ন দেখছে … তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম … মুখে বিলাপ… ফারাওন লাফ দিয়ে বিছানা ছাড়ে… টলতে টলত এগিয়ে যায় জল পাত্রের দিকে… ঢক ঢক করে গিলতে থাকে পানির বদলে সুরা]
ফারাওঃ না… না… না…! এ কনো হতে পারে না। এ কখনো হতে পারে না। নেফ্রতিতি তুমি শুধু আমার… তুমি … তুমি … এভাবে হারাতে পারো না সুপ্রিয়।
[ঘুমন্ত নেফ্রতিতি স্বামীর বিলাপে জেগে উঠে]
নেফ্র : কি হয়েছে প্রিয়তম স্বামী? ওমন করছো কেন তুমি? ওকি তোমার হাত কাপছে… যেন শান্ত শিষ্ট সমুদ্রের বুকে উত্তাল ঘুর্নিঝড় …তরঙ্গেরা ফুঁসে উঠেছে … প্রিয়তম কি হয়েছে তোমার?
ফারাওঃ ঘূর্ণিঝড় … উত্তাল তরঙ্গ… ভয়ংকর ক্রোধ … নাহ্… আমি আর সইতে পারছি না। দয়া করো! আমাকে দ্বিতীয় মৃত্যুর মতো ঘুমে তলিয়ে যেতে সাহায্য কর … আমি যে অসুস্থ … বিবেক বড় জ্বালাচ্ছে আমায়। দয়া করো, আমাকে সাহায্য করো হে স্বান্তনার নারী… আমি যে বড্ড অসফল।
[নেফ্রতিতি ধীরপদে এগিয়ে আসে… ঘুম জড়ানো চোখ, দ্বিধাগ্রস্থ হাঁটা। এক সময় টলন্ত স্বামীকে হাত দিয়ে ধরে বিছানার দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে সে।]
নেফ্র : কোন ভয় নেই আপনার। আপনি যে এই সমৃদ্ধ মিশরিয় জনপদের একছত্র অধিপতি… আপনি যে ঈশ্বর। ভয় কি সে? জীবিতেরা আপনার পায়ের নিচে, মৃতেরা হাতের মুঠোয়… পাতায় পাতায় বৃরো ধরে রেখেছে আপনার নাম। আসুন, নির্দোষ বিছানাটিকে আর কষ্ট দেবেন না প্রিয়তম। আসুন! এই অভাগা নারীটিকে ভীষণভাবে আলিঙ্গন করুন, পাপ-পুণ্যের হিসেব যতখুশি লিখে রাখুন এই তুলতুলে বুকে। প্রভু শান্ত হোন, চলুন।
[দু’জন ত্রস্ত পায়ে আবার ফিরে যেতে থাকে শূণ্য বিছানার দিকে।]

দৃশ্য-২
[মৃত্যুপূরীতে ওসিরিসের সভাক]
ওসিরিসঃ আজকের সভাগৃহ যথেষ্ট আনন্দ দায়ক ঠেকছে আমার কাছে। মানুষগুলো চমৎকার ফসল পেয়েছে এবার। তাদের চোখে মুখে হাঁসি, পদে পদে নৃত্য-গীত, আর স্তুতি-অর্চনা। সূর্যদেবের অনুরোধে আজ কোন মৃত্যু হবে না এদের।
পুত্র ২: কিন্তু তাতে কি? এ আনন্দ, এ হাসি-ঠাট্টা, স্ত্রী কিংবা প্রেমিকদের উচ্ছ্বাসের অতিশায্যে থাকবে না বেশিক্ষণ। কর দিতে দিতে, লাঞ্চিত- পীড়িত হতে হতে সবকিছু মেলাবে শূন্যে। পড়ে থাকবে অতৃপ্তির দল, কান্নার রোল আর ফুলে ফেঁপে উঠবে রাজার কোষাগার। কি ভাগ্যহত প্রজাদের দল… আহা!
ওসিরিসঃ এভাবে বলছ কেন পুত্র? কান্না আছে বলেই তো আজ এই আনন্দ, দিকে দিকে হাঁসিদের জয়গান। সূর্য্যদেব বড় তুষ্ঠ আছেন। তোমার কথা শুনলে মতিভ্রম ঘটতে পারে তার। সুতরাং, নীরব থাক। জীবনে কনো দু’ লাইন বেশি বুঝতে যেওনা। নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব চোখ বুলে শুধু  পালন করে যাও। ভূলে যেওনা মৃত্যু দেবতা এই ওসিরিস তোমার পিতা; তার ঔরসে তুমি গর্বিত, লাভবান। রাজা আর দেবতার নীতি কখনোই ভিন্ন নয়। রাজারা প্রজাদের রাজা আর রাজারও রাজা দেবতা। ভাগ্যদেবীর সাথে শীঘ্রই মিলিত হয়ে তোমার মগজটা উর্বর করো। এ তোমার জন্য যেমন ভালো হবে তেমনটি আমার জন্যও।
পুত্র ২: ঠিক আছে পিতঃ।  আমি আপনার দেখানো পথেই চোখ বন্ধ করে হেটে যাবো। একটুও এদিক-সেদিক তাকাবো না। এটাই হবে আমার ধর্তব্য।
ওসিরিসঃ পুত্র মেলিস!! তোমার জন্যেও আমার ওই একই নির্দেশ। ঠিকঠাক চালিয়ে নিও। মনে রাখবে, একেকটি ভুল মানেই একেকটি পতন।
পুত্র ৩: জো আঞ্জা পিতৃ দেব। আপনি আমাকে নিয়ে নিশ্চিত থাকতে পারেন। অহেতুক ভাবনার দ্বারা আমি আপনার মূল্যবান সময়ের পেন ঘটাবো না।
ওসিরিসঃ তথাস্তু মেলিস। আমি তোমাদের উপর ভীষণ প্রীত। যাও , আনন্দ কর; উপাদেয় শরাবের সঙ্গে ঢেলে নাও উপাদেয় নারী এবং অবশ্যই তা হারেমে।
পুত্র ২: শেয়ালটা যে কোথায় পড়ে রইলো। আজ সারাদিন তার সাক্ষাত মেলেনি। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
পুত্র ৩: হবে হয়তো কিছু একটা। তাতে কি ওকে নিয়ে ভেবো না।
ওসিরিসঃ হ্যাঁ, আমি কয়েকদিন যাবত কদাচিৎ সাক্ষাৎ পাচ্ছি তার। মুখের সেই প্রাক্তন উচ্ছলতা যেন মিইয়ে গেছে। সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে ওর। যাও দ্রুত তাকে মন্ত্রনা কে পাঠিয়ে দাও। দায়িত্বে গাফিলতি আমি একদমই বরদাস্ত করব না।
পুত্র ৩: তথাস্তু দেবরাজ। আমরা তাকে খুঁজতে বের হচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যে নিশ্চয়ই আপনি তার সাক্ষাৎ পাবেন।
ওসিরিসঃ তাই যাও তাড়াতাড়ি কর।
[বেশ কিছুক্ষণ পর শেয়ালমুখোর প্রবেশ। অনেকটা হতোদ্যন্ত। ওসিরিস আগামী কালের মৃতদের তালিকা দেখছেন।]
শেয়ালমুখোঃ আমায় স্মরণ করেছেন মহাদেব।
ওসিরিসঃ  হ্যাঁ, এসো। এতটা হতোদ্যন্ত হওয়াটা জরুরি কিছু নয়। তোমার কুশল কি? তোমাকে ইদানিং কোন বিশেষ কারনে বিচলিত দেখাচ্ছে। এখনও তোমার চোখে-মুখে লেগে আছে উদাসিনতার ছাপ।
শেয়ালমুখোঃ আমার কর্তব্যে কোনরুপ গাফিলতি নিশ্চয় খুঁজে পেয়েছেন আপনি। আমাকে মা করুন। আমি দ্বায়িত্বজ্ঞানে ক্রমশ ঢিলা হয়ে উঠছি।
ওসিরিসঃ এ বড় ভয়ংকর কথা পুত্র। তোমার উপর যে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তাকে তুমি অবহেলা করছো। তুমি নিজেও দেবতা, লোকে তোমাকে পূঁজোও করে। আর তোমাতেই কিনা ক্ষুদ্র মানব আচরণ … শুনি কিসে তোমাকে এ দায়িত্ব থেকে পালাতে উস্কে দিয়েছে।
শেয়ালমুখোঃ অভয় দেন তো বলি মহামান্য।
ওসিরিসঃ নির্ভয়ে বল।
শেয়ালমুখো : ফারাওন পত্নী অনিন্দ্য সুন্দরী নেফ্রতিতির সৌন্দর্য এবং তার প্রতি প্রেম আমাকে উদাসীন করেছে। আত্মা হাতে মৃত্যুপূরীতে ফেরার পথে স্নানরতা মানসীর উদোম শরীর, টানা টানা চোখ আর সূর্যদীঘল বুনো গন্ধের মেঘবতী চুল আমায় হরন করে নিয়েছে পিতঃ। আমি নিজের হাতে নিজেই জিম্মি হয়ে পড়ে আছি। দায়িত্বজ্ঞান সব লাটে উঠেছে। চাঙ্গে উঠেছে। আমায় সাহায্য করুন।
ওসিরিস : খুবই খারাপ কথা পুত্র। দায়িত্বজ্ঞান ভুলে, দেব শিষ্টাচার ছেড়ে তুমি ডুব দিয়েছো কোন এক সামাণ্য মানবীর প্রেমে… কি ভয়ংকর কথা!!!
শেয়ালমুখো : আমায় সাহায্য করুন। আমি যে নিরুপায় দেবরাজ।
ওসিরিস : এখন কি করতে চাও?
শেয়ালমুখো : ফারাওনকে  ছেড়ে স্বউৎসাহে তার আমার কাছে আসার চিন্তা চিরতরে বাদ। আমি চেষ্টা করেছি। কোন ফল হয়নি। বরং অপমানিত বোধ করেছি। দেবতা হয়ে প্রত্যাখিত … আমি তাকে তুলে আনতে চাই। সেটা যে কোন মূল্যে। শুধু আপনার সম্মতিটুকুর অপো।
ওসিরিস : শাস্ত্র ভাঙ্গবে!!!
শেয়ালমুখো : শাস্ত্র তো প্রস্তুতই হয় প্রভূদেরই জন্য। আপনি চাইলেই শাস্ত্র পাল্টে যাবে।
ওসিরিস : তোমার মাথায় মাল আছে। ঠিক আছে, যেমন তোমার ইচ্ছে! তবে তার আগে হেলিসকে ফারাও’র দরবারে নেফ্রতিতির বিনিময়ে প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়ে দাও। আমি জানি ফারাও মেনে নিতে পারবে না সেটা। কারণ, রমণীটির প্রতি প্রীতির গভীরতা তারও অত্যাধিক। আর এখানেই আমাদের মতা, শাস্ত্রের ফাঁক দিয়ে বের করে আনতে পারবে কাঙ্খিত প্রাপ্তি। প্রত্যাখিত হলে হেলিস তুলে আনবে নেফ্রতিতিকে … হা… হা… হা।
শেয়ালমুখো : আপনি আমাকে বাচালেন পিতঃ। আমাকে সাহায্য করবেন।
ওসিরিস : অভিনন্দন রইলো পুত্র। যাও তোমার দেবত্ব খাটাও। তুমিও যে রাজাদের রাজা। যাও…
[শেয়ালমুখো দ্রুত পদে সভাক ত্যাগ করে। চোখে-মুখে বিশ্রী উত্তেজনা।]

দৃশ্য-৩
[ফারাওনের দরবার। সিংহাসনে উপবিষ্ট একা চিন্তিত ফারাও। কপালে ডান হাত।]
হেলিস : সম্রাট ফারাওন…
ফারাওন : কে?… কে ওখানে??
হেলিস : আমি হেলিস। আমাকে তুমি বেশ ভালো করেই চেন ফারাও। আমি ওসিরিসের দূত। তোমার সাম্রাজ্যের জন্য, তোমার প্রভুত্বের জন্য বড় করুন দুঃসংবাদ বয়ে এনেছি।
ফারাওন : দুঃসংবাদ !! … শুধু দুঃসংবাদ বয়ে বেড়ানোর জন্যই কি তোমার জন্ম হেলিস। আফসোস ! তোমাকে হত্যা করার কোন উপায় আমার জানা নেই। তবুও তুমি নিস্তার পাবে না। হেলিস্ …

[কান্নার মৃদু ভাব। হেলিসের ডান হাতটিকে আলতো করে ধরে কপালে ঠেকায়ে ফারাওন, সিংহাসনের নিচে হাটু গেঁড়ে বসে সে। হেলিস অবিকৃত ]
হেলিস : তোমার বুদ্ধি আর অন্তদৃষ্টির তারিফ করছি আমি। তোমার মতার কাছে এক আধজন নেফ্রতিতি কিছুই নয় ফারা। দেবতার অতৃপ্তি পূর্ন কর। নিভিয়ে দাও নরকের সর্বনাশা আগুন। থামো, শান্ত হও। অবাধ্য হবার কোন পথ নেই তোমার। সারাদেশ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠবে মঙ্গা-খরা, দুর্ভিক্ষ আর প্লাবনে। আতংক আর অভিশাপে। তোমার প্রভুত্বে বিদ্ধ হয়ে উঠবে প্রশ্নের শরীর। শান্ত হও। থামো আর অবিচলিত হও। ধীরে-সুস্থে বেঁছে নাও নেফ্রতিতির বিকল্প। তোমার অসাধ্য কিছু নেই। আমি যাচ্ছি। তাকে ডাকো। সেজে গুজে নায়রের জন্য প্রস্তুত হতে বলো। দেবতার অসম্মান যে বড় ভয়ানক, বড় বিপদজ্জনক ফারাওন। আমি আবারও আসবো…
ফারাওন : ও!!! … কি নিষ্ঠুর … কি পাষাণ…কি বীভৎস সে দৃশ্য…আমি পারবো না…
[ফারাওন বিলাপ করতে করতে রাজদন্ড ফেলে দ্রুত বের হয়ে যায়।]

দৃশ্য -৪
[ফারাওনের শূণ্য দরবার। রাজ জৌতিষি এবং পুরোহিতের আগমন। সিংহাসনের পেছনে দাড়িয়ে দু’জন সুন্দরী নর্তকী বাতাস করছে। সূরা এগিয়ে দিচ্ছে আরেকজন।]
ফারাওঃ তোর সবকটি স্তন এই (কোমরের খাপ থেকে তরোয়ার বের করে) ধারের জিহবা দিয়ে কেটে নেব আমি। বড় বীভৎসভাবে কেটে নেব। এমনভাবে কেটে নেব যেন কসাইও ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। মূর্খ মহিলা…তোর শরীর এত নরম তুলতুলে কেন? (সামনে দাড়িয়ে থাকা নর্তকীটির কোমরে আঙ্গুল চেপে চেপে) কোন দেবতার তপ্ত শীসার মতো নিঃশ্বাস প্রবেশ করিয়েছিস এই আবৃত বুকে… যা নৃত্য কর। নেচে গেয়ে তৃপ্ত কর মরু দেবতার উরু… যা! না হলে এক কোপে তোর শিশ্নপথ আমি দু’টুকরো করে ফেলবো…যা!!
[নর্তকী ভয়ে-ডরে শীর্ণ হয়ে কোমর বাকিয়ে, নিতম্ব হেলিয়ে-দুলিয়ে নাচতে শুরু করে। চমৎকার সব আবেদনময়ী অঙ্গ-ভঙ্গীর সাথে সাথে গাইতে শুরু করে।]
মরুর বুকে জেগে দিল একটি দীর্ঘশ্বাস
এই ঠোঁটেতে পুড়েছিল তার ঠিকানা
বুকের আগুনে গলে ছিল যৌবনের মোম
ও রাজা এসো না কাছে এসো!
তুলে নাও সুপ্রিয়ার তুলতুলে হাত
নিস্তার নেই মৃত্যুর পথেও
ভালোবাসার মধু মেখে নাও সব
যত পারো এক নিমিষে… ও ওও আ আ আ …
[ফারাওন ঠিক দেখছে না। অন্যান্যরা দেখছে। তার মনোযোগ অন্য কোথাও। কপালে বিষন্ন হাত। নাঙ্গা ধারালো তরোয়ারটি একহাতে ধরাই রয়েছে। হঠাৎ সে বলে উঠে– ]
ফারাওঃ থামো। অসহ্য। এত রঙ্গ কেন? তোর এই মাখন শরীর আর এই বিষাক্ত বদনে, চোখে-মুখে … সামনে এসে দাড়াও… (নর্তকীটি ভয়ে কাপতে কাপতে ফারাওর ঠিক সামনে এসে দাড়ায়। বুকের ঠিক মাঝখানের সন্ধিতে বেশ গম্ভীরভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ফারাও বলতে শুরু করে) বাহ্! ভারী চমৎকার তো…(বলেই বাম স্তনে হঠাৎ করেই কোপ দেয় ফারাওন; আর বিড় বিড় করে উচ্চারণ করে) অবিশ্বাসীনি …যত্ত সব নষ্টের দল!!!
[শান্ত হয়ে স্বাভাবিক দাড়িয়ে থাকে নর্তকীটি। বুকে হাত দিয়ে আউ করে আর্তনাদ করতে থাকে খানিকটা সময় পরে যখন তা বিস্ময়ের ঘোরটা যন্ত্রণায় কেটে যায়। নর্তকী জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে পাটাতনের উপর… রক্তে ভেসে যাচ্ছে সব …ফারাওন নিশ্চল …সবাই মরার মত চুপ, যেন সবকিছু স্বাভাবিক।]
[এমন সময় জৌতিষি এবং পুরোহিতের প্রবেশ। নর্তকীর দিকে একটু তাকিয়ে নিয়ে দু’জনই একত্রে বলে উঠে…]
পুরোহিত এবং রাজ জৌতিষিঃ  তাকলিফ প্রভূ…
ফারাওঃ  কি অবস্থা রাজ্যের ?
পুরোহিতঃ কি আর বলবো মহারাজ সমস্যাটা গুরুতর। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এবার কিছু একটা করতেই হবে।
ফারাওঃ দমন করুন। এক্কেবারে শেঁকড়শুদ্ধ উৎখাত করে দিন ছোটলোক গুলোকে। বিশেষ সৈন্যবাহিনী ব্যবহার করুন। অর্থ-সম্পদ ব্যয় করে রাজ মতা বাড়ান। প্রয়োজনে সেনাপতির সঙ্গে পরামর্শ করুণ। দেবতাদের অসন্তুষ্টির কথা জানান। এরপরও কাজ না হলে সবকটার জিব কেটে নিন; রক্তে ভাসিয়ে দিন নীল নদের পেট। আহ্… মঙ্গা…দুর্ভিক্ষ… মহামারি… অশান্তির আগুনে জ্বলে পুড়ে ছারখার আমার অর্ন্তলোক। জৌতিষি কি দেখছেন… রাজ্যের ভবিষ্যৎ ?
জৌতিষিঃ ধ্বংস প্রভূ। শ্রেফ ধ্বংস। মৃত্যুদেহের তপ্তশ্বাসে ছুটে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক। কোন সৃষ্টি নেই। লাশ পঁচা গন্ধে আকাশে শুধু চাতক শঙ্খচিল।
ফারাওঃ ওহ্ …না… কী দু:সহ… ভাগ্য দেবী হাত মিলিয়েছেন ওসিরিসের সাথে। আপনারা মুক্তির উপায় খুঁজুন… শ্রীঘ্রই… এখনই। আছে কি এমন কোন উপায়??
পুরোহিতঃ আছে। অবশ্যই মুক্তির উপায় আছে প্রভূ।
ফারওঃ উপায় আছে! তবে মুখে তালা মেরে রেখেছেন কেন? তাড়াতাড়ি বলে দাও, না হলে কসম, এই ধার দিয়ে আমি কেটে নেব তোমার মুখ।
জৌতিষিঃ শান্ত হোন মহারাজ। নেফ্রতিতির কোন বিকল্প আমাদের সন্ধানে নেই। তবে নিরুপায় হয়ে এবার আমাদেরকে তা তৈরি করে নিতে হবে। তবে পক্রিয়াটি খুবই বিপজ্জনক আর ফলাফল দৈবাৎ বুমেরাংও হয়ে উঠকে পারে। তবে উপায় বলতে এই একটাই খুঁজে পেয়েছি আমরা।
ফারাও : কি রকম… তাড়াতাড়ি বলো।
পুরোহিত : রাণী মার সমবয়সী একজন বিবাহিত এবং রক্ত সম্পর্ক আছে এমন একজনকে সুন্দরী নির্বাচন করতে হবে।
জৌতিষি : তারপর জাদু মন্ত্র প্রয়োগে রাণী মার আত্ত্বাসমেত অবিকল রুপে তাকে তৈরি করে নিতে হবে। যেহেতু আপনার আসল রাণী মাকে চাই ই চাই, সেহেতু নকল রাণী মা’কে পাঠাতে হবে ওসিরিসের কাছে।
ফারাও : ওসিরিসরা তো চাইলে তাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে… দুর্ভি, হানাহানি, কিংবা মৃত্যুর খেলা কেন খেলতে গেলো?
পুরোহিত : সূর্যদেব তাকে বাঁধা দিয়েছেন। তাই তুলে নেয়ার বদলে আপনাকে বাধ্য করতে চাইছেন। এবং আপনাকে বাধ্য হতেই হবে, না হয়ে উপায় নেই, কেননা তিনি মৃত্যু দেবতা, সকল মৃত আত্মার অধিপতি।
জৌতিষিঃ কিন্তু সমস্যা একটা আছে। এবং এটাই ত্রুটি। ভয়াবহ দুর্বলতা। যদি ওসিরিসের পাতাল পুরীতে তার কোন কারনে মৃত্যু হয় তাহলে আসল রাণী মাও মারা যাবেন। কেননা, মৃত্যুদেবতার সাথে প্রতারনার শাস্তি ভীষণ ভয়ংকর হতেই পারে। খুব সম্ভবতঃ তিনি রাণী মাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আপনাকে ভালোবাসা বিয়োগে তিলে তিলে মারবেন। তিনি চাইলে আপনারও হঠাৎ করেই মৃত্যু হবে। আমাদের কারো কোন কিছু করার থাকবে না, বলার থাকবে না কেবল চোখ দুটোকে খুলে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া।
ফারাও : হা…রে…ভালোবাসা!! আমি এত ভয়ানক, এত বীভৎস। এত বীভৎস অথচ প্রেমিকার আঁচল আর শূণ্যতায় ডুবে মরেছি… কেন? বিধি বড়ই বিচিত্র আর উদ্ভট জিনিস ।
পুরোহিত : এখন ভেবে দেখুন কি করবেন?
ফারাও : সাঁতার যখন জানিই না, আর দরিয়াতে যখন পড়েই গেছি তখন ডুবতে আমাকে হবেই। তবে ডোবার আগে শেষ সুযোগটা কাজে লাগাতে চাই। যান দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আর আমার জন্য একটা বৃহদায়তন সমাধি ত্রে প্রস্তুতির নির্দেশ দিন। খেওপসদের খোঁজ করুন। নেফ্রর সমাধি হবে আমার ডান পাশে। সমাধি গাত্রে লেখা থাকবে আর তারা ভাগ্য দোষে মরেছিল। যান। ওসিরিসকে অভিশাপ দিয়ে একটি স্তম্ভও বানাতে নির্দেশ দিন।
জৌতিষি : আপনি নিশ্চিত থাকুন প্রভূ। সব কিছু সময়মত প্রস্তুত হয়ে যাবে। সিন্ধান্তের জন্য আপনাকে অভিনন্দন।
[পুরোহিত এবং জৌতিষির প্রস্থান। একে একে সবাই দরবার ত্যাগ করে। ফারাওন বিষন্ন দাড়িয়ে স্থির।]

দৃশ্য -৫
[পুরোহিত এবং জৌতিষী একত্রে মন্ডপের পাশে বসে]
দূত : মহামান্য পুরেহিত এবং জৌতিষী কে অভিনন্দন। উপযুক্ত শরীর পাওয়া যায়নি। তবে এর জন্য এত বেশি খোজাখোঁজি করতে হয়েছে যে আমাদের লোকেরা কান্ত এবং শ্লথ হয়ে পড়েছে।
পুরোহিত : কি সর্বনাশা কথা বলতে এসেছে তুমি!
জৌতিষী : সম্রাট শুনলে আমাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা আছে।
পুরোহিত : তা হলে এখন আমাদের করনীয় কি জৌতিষী সাহেব? সময়ও যে? বেশি নেই হাতে।
[চোখ বন্ধ করে জৌতিষী কি যেন ভাবছেন। মন্ডপ থেকে ধূপের ধোঁয়া আর অদ্ভূত আলোক রশ্মির প্রপেণ এক অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। চিন্তিত পুরোহিত এবং দূত। পুরোহিত দূতকে চলে যাবার ইশারা দেন। কিছুণ পর জৌতিষী চোখ খোলেন। হাত তালি দিয়ে বলেন-]

এই কে কোথায় আছিস? আমার কষ্ঠি গনণার জিনিসগুলো নিয়ে আয়।
[একজন ভৃত্যের প্রবেশ। হাতে নিয়ে কষ্ঠি গণনা করতে বসে পড়েন জৌতিষী। পুরোহিত অদ্ভুতভাবে তা দেখছেন আর মাঝে মাঝে কপাল কুচকাচ্ছেন। ভৃত্যের প্রস্থান।]
জৌতিষী : নাহ্… হচ্ছে না! ব্যাপারটা যথেষ্ট জঠিল। মৃত্যু দেবতার সাথে জালিয়াতি বলে কথা। বড়ই জটিল কাজ। আমরা কি তা আসলেই করব?
পুরোহিত : উপায় নেই জনাব। দেবতা যেমন এক দিকে, সম্রাটও তেমনি একই দিকে। দু’জনই ভয়াবহ রকমের নিষ্ঠুর। গর্দান এবার বোধ হয় আর বাঁচানো গেলো না। পালাতেও পারব না ফারাওনের হাত থেকে। এটাও নিশ্চিত। মরন ফাঁদে পড়েছি বুঝলেন।
জৌতিষী : আপনার জন্যই তো। কি দরকার ছিল উপায় বলতে যাবার? মরবি তো মর এক্কেবারে বুধোর ঘাড়ে…
পুরোহিত : আরে ভাই, আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের তান্ত্রিক মন্ত্র-সাধনায় একটা কূল হবেই। আর দেবতা তো দেবতাই। মানুষের ভেতরও মতার দেবতা আছে। আমরা তাই চেয়েছিলাম।
জৌতিষী : বুঝলাম না সাহেব???
পুরোহিত : আরে বুঝলেন না!! আমরা যদি সফল হই তাহলে সম্রাট আমাদের মতাকে আরো অনেক বেশি সমীহ করে চলবেন। রাজার মতা প্রজাদের উপর। আর আমাদের মতা থাকবে রাজারও উপর। বুঝেন নি?
জৌতিষী : বুঝেছি …বুঝেছি…অর্থ, বিত্ত, ভৈরব-প্রতিপত্তি…অন্দরমহল ভর্তি গোলাপ সুন্দরীদের দল…ইস! ভাবতেই কেমন জানি শিহরন আর পুলক বোধ করছি।
পুরোহিত : হ্যাঁ, এইতো বুঝলেন। আপনি মাইরি যোগ্য লোকই বলতে হবে। কিন্তু আমরা কি হেরে যাচ্ছি?
জৌতিষী : আরে না, না। বলি রক্তের খেল এখনও তো বাকী রয়ে গেছে। আপনি কি ভূলে গেছেন যে আমিই সেই ফ্যানিয়াস, যে কিনা গোরিয়ানকে পর্যন্ত ঘোল খাইয়ে দিয়ে ছিলাম। তাকে হারিয়ে আমি হয়েছিলাম মহাবিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গণক। একটু অপেক্ষা করুন।
পুরোহিতঃ ওহ..হো!!
[দু’বার হাততালি দিয়ে] আমিতো ভূলেই গিয়েছিলাম ব্যাপারটা…
[সেই ভৃত্যটির প্রবেশ]
ভৃত্য : আদেশ করুন প্রভূ। আপনার জন্য জান কোরবান।
জৌতিষী : বলির জন্য একজন কুমারী চাই। আগুনের মতো সুন্দরী । যাও দ্রুত। দেরি হলে তোমাকেই বলি দেব।যাও।
[দু’জনই বিশেষ ধরনের পোষাক পরিধান করলেন। একজন কালো আলখেল্লা। অন্যজন রক্তলাল! তারপর শরাব পান করতে করতে প্রস্তুত হতে লাগলেন মানসিকভাবে। একপাশে প্রস্তুত হল যুপকাষ্ঠ। ভৃত্যটির প্রবেশ। এক হাতে একজন মাথা হেট করে থাকা যুবতীকে ধরে রাখা।]
ভৃত্য : অভিনন্দন প্রভূ। কুমারি পাওয়া গেছে। বলির উদ্দেশ্য সফল হোক।
জৌতিষী : তুমি আমাকে নির্ভয় করলে বৎস। তোমাকে আমি পুরষ্কৃত করব। এখন যাও। আর ল্য রাখবে, কোন ভাবেই যেন আমাদের কর্ম বিঘ্নিত না হয়।
[কুমারীটি লজ্জিত, ভীত-সন্তস্ত্র পদে দাড়িয়ে। ভীতিকর পরিবেশ আর আসন্ন বিপদের সম্ভাবনায় মৃতের মতো ফ্যাকাসে তার মুখশ্রী। কম্পিত শরীর একখন্ড ছোট্র সাদা বসনে আবৃতা প্রায় নগ্ন।]
জৌতিষী : এসো বাছা! ভয় কিসে তোমার? আমাদের তৃপ্ত কর, তোমার কবুতরী তুলতুলে বুকে আকষ্ঠ গ্রহন করে পূন্যাত্মা হও। নিজেও তৃপ্ত হও।
[জৌতিষী সমুখে এগিয়ে গিয়ে কুমারীটির কম্পিত হাতে চুমো দেয়]
জৌতিষী : মহামান্য পুরোহিত। আমার এ ক্ষুদ্র উপহারটুকু গ্রহন করে ধন্য করুন।
[পুরোহিত অভ্যস্ত পায়ে এগিয়ে যায়। মুখে অভিশপ্ত হাসি। জৌতিষী পিছিয়ে এসে মুন্ডপের ধারে বসে আর বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে শুরু করে। নারী কন্ঠ বাতাসে ধ্বনিত হয়– নাহ্, না… আ আ… না… আ… আ… মঞ্চের সব লাইট নিভে যায়। জৌতিষীর মন্ত্রপাঠের শব্দ আরো তীব্রতর আর উঁচু হয়। কুমারীর নিষ্পাপতাকে চুষে খায় বিদঘুটে অন্ধকারে শব্দের বেগ। মন্ডপের আগুন শুধু জ্বলে দাউ – দাউ।]
[ধীরে ধীরে লাইট জ্বলে উঠবে]
[ক্লান্ত আর পরিশ্রান্ত পায়ে মন্ডপের দিকে হেঁটে আসছে পুরোহিত।]

জৌতিষী : অভিনন্দন মশাই। উপহার পছন্দ হয়েছে তো। হোহ হো হো…
পুরোহিত : চমৎকার মশাই। চমৎকার। এরকমটি আগে আর ঠিক পেয়ে উঠি নি। সত্যিই অস্সাধারন…!!!
জৌতিষী : অসাধারনকে গ্রাস করে আপনিও এখন অসাধারণ জনাব, নিন আমাকে সাহায্য করুন।
[মৃদু ক্রন্দনরত ষোড়ষীকে টেনে তোলে দু’জন। তারপর কালো কাপড়ে চোখ বেঁধে দেয় জৌতিষী। ললনার এলোমোলো বসন আরো এলোমেলো হয়। মৃত্যু ভয়ে ভীত একটি কচি মুখে নিঃস্তব্ধ বিদ্রোহের চাপ সুস্পষ্ট। নীরব ঘৃনার মশাল জ্বলে চোখে। জৌতিষী তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে চলে যুপকাষ্ঠের দিকে। কায়দামত বসিয়ে পরবর্তী পদেক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নেয়।]
জৌতিষী : নিন মশাই।
[বলেই খড়গটা পুরোহিতের হাতে তুলে দেয় সে। নিস্তেজ ভাবটুকু কেটে গেছে সবার।]
আপনি পুরোহিত মানুষ। এ কাজটুকুর পবিত্রতা তাই আপনার হাতেই সমর্পন করিলাম।
[পুরোহিত হাতে নেয় খড়গ এবং ধীরে ধীরে উচু করে তোলে মাথার উপর।  দু’জনই বিড় বিড় করে উচ্চ স্বরে মন্ত্র পড়ে… জয়, ভাগ্য দেবীর জয়…. মৃত্যু শীৎকার শোনা যায়। ছিড়িক মেড়ে এক ঝাকে রক্ত এদিক-সেদিক ছিটিয়ে পড়ে। সবার শরীরে  রক্ত লাগে।]
জৌতিষী : ইস… ছোট লোকটার রক্তে কি দুর্গন্ধ … বমি এসে যাচ্ছে
পুরোহিত : আর বলবেন না মশাই। ওর ভাগ্যি যে মরার আগে আমার ঔরস নিয়ে গেল।
[জৌতিষী একটি খুলিতে রক্ত লাগায়। ভরপুর রক্ত। তারপর আগুনে ফেলে দিয়ে বিড় বিড় করে মন্ত্র আউড়ায়। সবার চোখ বন্ধ। হাটু গেড়ে বসে ডান হাত বাম বুকে নেয়।তারপর সেজদা দেবার ভঙ্গীতে দু’হাতকে একবার উপরে নেয় একবার নীচে। মন্ত্র পাঠের স্বর তীব্রতর হয়। কিছুক্ষণ পর…]
পুরোহিত : এবার তবে কি করণীয়?
জৌতিষীঃ আপনার জন্য কষ্টদায়ক হলেও ব্যাপারটা সত্যি যে… এখন আপনি আর তন্ত্রের বিরুদ্ধে যেতে পারবেন না।
পুরোহিত : মানে? !
জৌতিষীঃ মানে কিছুই না। আপনার স্ত্রী পরম আদরের ধনকে বিসর্জন দিতে হবে।
পুরোহিত : মানে? !
জৌতিষীঃ সিংক্রি অর্থ্যাৎ আপনার পত্নী, নেফ্রতিতির রক্ত সম্পর্কযুক্ত জমজ বোন ব্যাপারটা আপনি জানেন?
পুরোহিত : আপনি এসব কি বলছেন? এসব আমার জানা নেই।
জৌতিষীঃ তার পরিবার থেকে কাফেলা যাত্রায় সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ঘটনাক্রমে আপনার পত্নী হয়।
পুরোহিত : তাহলে!! মানলাম। আমি জানতাম না যে সে নেফ্রর আত্মীয় অর্থাৎ জমজ বোন। যদিও তাদের মধ্যকার মিল ছিল অনেক কম। আমি ভাবিনি । কেননা এটা আমার জন্য জরুরি কিছু ছিল না। কিন্তু তাহলে ও বা কি…
জৌতিষীঃ আপনি মিছেমিছি ভান করছেন কেন? আপনি অত্যন্ত বিজ্ঞজন এবং কৌশলী। আপনি বেশ ভাল করেই বুঝতে পারছেন যে, আমাদের পরিকল্পনার বাস্তবায়নে তার বিসর্জন দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি।
পুরোহিত : না…
জৌতিষীঃ তাকে বলি দেয়া হবে না। শুধু পরিবর্তন করা হবে।
পুরোহিত : না… না…এটা কোনভাবেই হতে পারে না!!
জৌতিষীঃ আপনার গর্দান রাখতে হলেও আপনাকে তা অবশ্যই করতে হবে। আপনার সব পথ বন্ধহয়ে গেছে। ফিরে যেতে পারবেন না। মন্ত্র বলে বলি রক্তের রীতি অনুযায়ী আপনি এখন প্রভাবিত ।
পুরোহিত : না…না… না… সিংক্রির প্রিয়তমা মহিলা আমার… আমি পারবো না…আমি পারবো না…
জৌতিষীঃ আপনাকে অবশ্যই পারতে হবে। বাকী সব আপনার ইচ্ছে ।
[কপালের ঘাম মুছতে মুছতে পুরেহিত কিছুটা স্থির হয়]
পুরোহিত : হা… নিয়তি … আমাকে এভাবেও মরতেই হলো … ঠিক আছে, মহাশয়। ব্যবস্থা নিন। এই… এই যে আমি আপনার সামনেই নিজেকে সামলে নিলাম।
জৌতিষীঃ চমৎকার। এই তো আপনি প্রমাণ করলেন যে আসলেই আপনি জ্ঞানীদের ভেতর একজন সূর্য। সোনালি অগ্নির মতো বিকীর্ণ জিহবা তার।
[জেীতিষী হাত তালি দেয় । কুমারিটির  দ্বিখন্ডিত লাশ পড়ে থাকে স্থবির। এরই মধ্যে দৌড়ে হাপাতে হাপাতে ভৃত্যটির প্রবেশ। জৌতিষি ভৃত্যের দিকে স্থির দৃষ্টি দিয়ে বলে…]

জৌতিষিঃ মহামান্য পুরেহিতের অন্দর মহলে যাও। এবং সিংক্রির মহাশয়াকে যথেষ্ট আদর যত্নের সাথে গিয়ে বলো যে (একটু থেমে, পুরোহিতের ম্লান আর নির্লিপ্ত চেহারাটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে), মহামান্য পুরোহিত তার উপস্থিতি আশা করছেন… এই এখানে। তিনি যেন উত্তম বসন-ভূষনে পদধূলি দেন। যাও দ্রুত।
[মহাশয়রা সূরা পানে মগ্ন হয়। উদাসীনতার ছায়া তাদের দু’জনের মধ্যেই সুস্পষ্ট। একই রকমভাবে হাপাতে হাপাতে ভৃত্যটি চলে যায়।]
পুরোহিতঃ হে একাকীত্ব… তুমি এসো এসো … এই আমাতে এসো… আমি তোমার জন্য অপো করে আছি… স্বাগতম হে একাকীত্ব …
জৌতিষী : আহা… শান্ত হোন। থামুন মহামান্য পুরোহিত। সিংক্রির অপো শ্রেয়তর নারী আপনার পথ পানে চেয়ে আছে। আপনার এই অভ্যস্ত দু’টি হাতের নিষ্ঠুরতা মোটেও কাকতাল নয়। থামুন! আনন্দ করুন । আমাদের অন্য কোন উপায়ই ছিল না।
পুরোহিতঃ ঠিক। আপনি পুরোপুরি ঠিক কথাই বলেছেন মশাই।
[পুরোহিত উঠে দাড়ায়, হাঁটতে হাঁটতে এক কোনে গিয়ে পা দিয়ে বৃত্ত আকতে থাকে। জৌতিষীর মুখে ক্ররহাসি… হা হা হা…সূরায় মেশানো হচ্ছে মূর্ছার ঔষধ। এক সময় ভৃত্যটি সিংক্রিকে সাথে নিয়ে সেখানে নিঃশব্দে প্রবেশ করে। কালো রেশমী কাপড়েরর উজ্জল চকচকে পোষাক তার পুরো শরীর যুড়ে। স্কিন টাইট যেন মুখাভিনয় করতে এসেছেন। ভৃত্য তার দিকে তাকিয়ে মুখে তর্জনী আঙ্গুল ঠেকিয়ে মুখ দিয়ে আস্তে করে শব্দ করে তাকে ইশারা করে… হিসসসস্…এরপর সে জৌতিষির দিকে তাকায়। জৌতিষির হাতে ঔষধের চমৎকার স্বর্ণাধারটি ধরা। মঞ্চে ফ্যাকাশে নীল মৃত্যুর মতো ছড়িয়ে পড়ছে সবদিকে। এর মধ্যেই হাইলাইটেড আলো পড়ছে জৌতিষির হাতে ধরা বাটি, আংগুলের আংটির পাথর, আর চোখ দু’টিতে… জলজল করছে।]
ভৃত্যঃ প্রভূ। তিনি এসেছেন। অতিশয় চমৎকার বেশ-ভূষায় সিক্ত এক নারীর বেশে। আশ্চর্য নির্মলতার যেনো এক অবিকল প্রতিমা। আদেশ দিন।
জৌতিষী : মশাই, প্রিয়তমাকে স্বাগত জানান।
পুরোহিতঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ … তাকে আসতে বল।
[ভূত্যের প্রস্থান। সিংক্রি একা ঠায় দাড়িয়ে। এক্কেবারে নির্জীব আর নির্লিপ্তভাবে।]
সিংক্রির : প্রভু, আমাকে তলব করেছেন! এই জান আপনার জন্য কোরবানী হোক।
পুরোহিতঃ ও ভাবে বলো না…শেষে না নিজেই কোরবানী হয়ে যাই অথবা তুমি।
সিংক্রি : তি কি ? লাভ যেটুকু সবতো আমারই হবে প্রভূ, প্রিয়তম আমার, আপনাকে বড়ই বিষন্ন বোধ হচ্ছে। আমি কি আপনার কোন উপকারে আসতে পারি?
জৌতিষী : আরে না, না। তেমন কিছুই নয়। উপকার করবেন তো বসুন! এই এইখানে বসুন। ধীর স্থির হয়ে বসুন। মশাই! পত্নীকে সূরা দিয়ে উত্তম রুপে আপ্যায়ন না করাটা কেমন যেন বিদঘুটে দেখাচ্ছে।
[পুরোহিত এবং সিংক্রি স্থির হয়ে বসে। সিংক্রি নিজের হাতেই শরাব ঢেলে দেয় সবার পানপাত্রে। তারপর পুরোহিত সেই বাটিটি তুলে দেয় সিংক্রির হাতে। সিংক্রি বিনা বাক্য ব্যয়ে পান করে নেয়। সবার আগে… চুক্ চুক্। পান শেষে কিছূন পর সিংক্রি ঢুলে পড়ে যায়। তাদের দু’জনের হাতেই শরাবের পাত্র ধরা। নির্লিপ্ত আর সুস্থির।]
পুরোহিতঃ আমাকে মা করো প্রিয়তমা। আমি নিরুপায় ছিলাম। নিন জৌতিষ মশাই। আসল ক্রীড়া শুরু করতে আর বিলম্ব কেন?
জৌতিষী : উত্তম কথা, জনাব। আপনি বিচলিত হবেন না। পরবর্তী অংশে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আমার আর কোন কাজ আছে বলে মনে করি না। প্রক্রিয়া এবং অধিকারটুকু শুধু আপনারই এখতিয়ারে। স্থির হোন এবং এগিয়ে যান। ভূল করবেন না। মনে রাখবেন, অন্য যে কোন পূর্ব অভিজ্ঞতার চেয়ে আজকের এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।
[পুরেহিত কিছুন স্থির থেকে পড়ে থাকা সিংক্রির বুকের উপর ঝুকেঁ পড়ে মন্ত্র পাঠ করতে শুরু করেন। আলো নিভিয়ে আসে, কুন্ড জ্বলে, আগুনের সর্পজিহবার ছায়া পড়ে, দাউ দাউ করে জলছে মঞ্চের পেছনে থাকা কালো পর্দায়। দু‘জনের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি ছায়াকারে দেখা যায়। মন্ত্রের গুনগুন শব্দ বাড়ে দু’জনেরই মুখে… বেড়েই চলে… একসময় থেমে যায়। পুরো স্টেজ তীব্র আলোকে ঝলসে উঠে।]
পুরোহিতঃ স্বাগতম নেফ্রতিতি। পৃথিবীতে আপনার পদ অভিযান শুভ হোক! আমি পুরোহিত এন্তাস এবং উনি রাজজৌতিষী ফ্যনিয়াস। আপনাকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য তৈরি করা হয়েছে। আপনাকে নেফ্রতিতি বলে সম্বোধন করা হয়েছে কেননা আপনি এই নামেই পরিচিত হবেন। আমাদের আদেশ আপনাকে মেনে চলতে হবে। এবং আপনাকে চলতেই হবে। বুঝেছেন ?
নকল নেফ্র : আমার কাজ ???
জৌতিষী : আপনাকে মৃত্যুদেবতা ওসিরিস পুত্রের কাছে প্রেমিকা হিসেবে পাঠানো হবে এবং আপনি তাদের প্রতি পরিপূর্নভাবে আন্তরিক হবেন, ভালোবাসবেন অথবা অভিনয় করবেন। তবে যে কোন মূল্যেই হোক আপনার মৃত্যু আসন্ন হলে তা ঠেকাতে হবে। ব্যাস, আপনি প্রস্তুত ?
নকল নেফ্র : আমি প্রস্তুত।
জৌতিষী : চমৎকার, চমৎকার। (পুরোহিতের দিকে চেয়ে) মহাশয়! তুলনা হয় না আপনার!! অভিনন্দন গ্রহন করুন আর আনন্দ করুন। চলুন পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া যাক।
[পুরোহিত নেফ্রর দিকে বিষন্নভাবে তাকিয়ে আছেন। এই মন, এই শরীর নিয়ে নেফ্র একটু আগেও তারই ছিল এটা ভেবে…নারীর ভয়াবহ নিয়তি দেখে পুরোহিত পুরোপুরি স্তব্দ। সবাই ক্রস্ত পায়ে প্রস্থান করতে শুরু করে। জৌতিষী উল্লাসিত। নেফ্র যান্ত্রিক।]

দৃশ্য -৬
[ফারাওনের দরবার]
ফারাওঃ আসুন, আসুন। আপনাদের কাজের অগ্রগতি জানতে আমি উদগ্রীব হয়ে আছি। কছম যদি আপনারা ব্যর্থ হয়ে থাকেন, তাহলে আপনাদের মৃত্যু আজ আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। খোদ ওসিরিস এলেও না।
পুরোহিত : এক্কেবারেই উদগ্রীব হবেন না প্রভূ। আপনার জন্য সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। আপনি শুনলে হয়ত খুশিই হবেন যে আমরা আমাদের এখন পর্যন্ত করা পরিকল্পনায় সফল হয়েছি।
জৌতিষী : দেশের মঙ্গা, খরা, জরা-কুঠি এবার দুর হবে। আপনি আরেকবার সফল হবেন। আনন্দ করুন প্রভূ। হেলিসকে অনুমতি দিয়ে দিন।
পুরোহিতঃ শুধু এতটুকু মনে রাখবেন, মৃত্যুপূরীতে যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে, তার জন্য আমরা কোন রকমেই দায়ী থাকবনা। বাকি সব নিয়তি। ভাগ্য দেবীকে তুষ্ট করতে ব্যাপক পূঁজোর ব্যবস্থা করুন ।
ফারাওনঃ আপনারা সত্যিই মহান। আপনাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। যান, আরাম করুন। রাজ-কোষাগার থেকে যতখুশি তুলে নিন সম্পদ অথবা সম্পত্তি যান।
[কুর্ণিশ করে ফারাওন ব্যাতীত সকলের প্রস্থান]

দৃশ্য -৭
[ওসিরিসের দরবার।
একান্তে আলাপে মশগুল তিনপুত্র আর স্বয়ং ওসিরিস। সভাসদরা নেই।]
শেয়ালমুখো : প্রভু। আমি যে আর স্থির থাকতে পারছি না।
ওসিরিস : স্থির হও, বৎস। নেফ্রতিতিকে আমাদের হাতে তুলে দিতেই হবে তার নতুবা তার এবং তার সম্রাজ্যের ধ্বংস অনিবার্য। তবে নমুনা হতিমধ্যে তুমি নিশ্চয় দেখেছ। ভয়াবহ রকমের দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে আছে ফারাও। ও আর ফাঁকি দিতে পারবে না। ধরা তাকেই দিতে হবে।
শেয়ালমুখো : কিন্তু সূর্য্যি দেব যেভাবে বিরোধীতা করছেন তাতে আমার মনে সন্দেহ জাগছে।
ওসিরিস : চিন্তা করোনা। সূয্যি দেবের মতা সূর্যি দেবের হাতে। আর আমার মতা আমার হাতে। তাকে হার মানতেই হবে।
পুত্র ২ : তা আমি মানছি পিতৃদেব, তা আমি মানছি। আপনার অসাধ্য কিছুই থাকতে পারে না। আমি শান্ত হতে চেষ্টা করছি।
পুত্র ৩ : তাই বরং ভালো বৎস। সবুরে মেওয়া ফলে জানোইতো।
[হেলিসের প্রবেশ]
হেলিস : প্রভু, ফারাও নেফ্রতিতিকে দিতে রাজী হয়েছেন।
শেয়ালমুখো :  কি বললে, কি বললে হেলিস? আমি কি আমার কান দু’টোকে তাহলে সত্যিই বিশ্বাস করব।
ওসিরিস : কেন করবে না, পুত্র। তোমার পিতার মতায় কি তোমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে?
শেয়ালমুখো : আমার অপরাধ মার্জনা করবেন, পিতা। আমি অন্দর মহলে যাচ্ছি। নিজেকে উত্তম রুপে সজ্জিত করে ফিরব।
পুত্র ২ : হা … হা… হা… যাও, তাই কর। দুঃখ ভুলে যাও। সন্দেহ দূর কর, যাও।
[শেয়ালমুখোর প্রস্থান]

হেলিস : তাহলে কি আমি ফারাওনের দরবারে রওনা দেব প্রভূ ?
ওসিরিস : হ্যাঁ যাও এবং তাকে আদরের সহিত উৎসাহ সহকারে নিয়ে এসো।
হেলিস : নির্দেশ পালনের শপথ নিচ্ছি প্রভূ ।
[ডান হাতটিকে বাম বুকে রেখে দ্রুত প্রস্থান করে হেলিস]

দৃশ্য -৮
[ফারাওনের শূণ্য দরবার]
হেলিসঃ আপনার চমৎকার সিন্ধান্তের জন্য ধন্যবাদ। আপনি যথার্থই দেব সাধক। আপনার উপর মৃত্যুদেব যথেষ্ট তুষ্ঠ হয়েছেন এবং তাই আপনার কৃত অপরাধগুলোকে তিনি মার্জনা করেছেন।
ফারাওন : ধন্যবাদ, হেলিস। আমার মতিভ্রম হয়েছিল। ভেবে দেখলাম এতবড় ভুল করাটা ঠিক হবে না। তাই আর কি…
হেলিস : তাকে কিভাবে নিয়ে গেলে তোমার ভালো হয়?
ফারাওন : রাত্রিতে আমার শয়নে শয্যা থেকে তাকে নিঃশব্দে উঠিয়ে নিয়ে গেলে সবচেয়ে ভালো হয়।
হেলিস : তাই হবে। সবকিছু অরে অরে পালিত হবে।
[হেলিসের প্রস্থান]
[পর্দা ধীরে ধীরে নামছে…]

দৃশ্য- ৯
[পর্দা ধীরে ধীরে খুলছে…]
[শেয়ালমুখোর শয়ন শয্যা]
[শেয়ালমুখো বির্মষ। আধ-শোয়া হয়ে ভাবছে। নেফ্রতিতির প্রতি ভালবাসা তাকে এভাবে বসিয়ে রেখেছে। হটাৎ, তার পাশেই নেফ্রতিতি ঘুমিয়ে। সে বিস্ময়ের ঘোরে পড়ে অবাক হয়।]
শেয়ালমুখো :  কি অদ্ভুত দেব খেল! এই আছে এই নেই। স্ন্দুরী নেফ্রতিতি নির্ভীক ঘুমিয়ে। তার কোন ভয় নেই। এই মৃত্যু পূরিতে কোন দেবতার সাধ্যি থাকবে না তাকে  ছোয়ার। সে থাকবে অয়। আমার জীবন কবচ থাকবে তোমার হাতে। তুমি সুরতি প্রিয়।
[স্ফিংস তার বাহু থেকে এক ফোঁটা রক্ত আঙ্গুলে নিয়ে ঘুমন্ত নেফ্রতিতির নাভিতে রেখে দেয়।]
শেয়ালমুখো :  তুমি এখন আমার মতই সুরতি। যখনই তুমি ব্যর্থ হবে মনে রেখ আমারও মৃত্যু হবে। তোমার সাথে সাথেই।
[শেয়ালমুখো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আর নকল নেফ্রতিতির নিষ্পাপ
বুঁজে থাকা চোখ দু’টির উপর আঙ্গুল বুলিয়ে দিতে থাকে।]

দৃশ্য -১০
[নকল নেফ্রতিতি দূর্গের ছাদে এককোনে দাড়িয়ে দাড়িয়ে আলো বাতাস খাচ্ছে। স্নানের জলগুলো তখনও শুকোয়নি। খোলা চুল উড়ে যাচ্ছে দুষ্ট বাতাসে। তার চেহারাতে ফোকাস। বাকী স্টেজ হাল্কা অন্ধকার। একটা জ্যন্ত প্রতিমা দেখাচ্ছে তাকে। ওসিরিস সে দিক দিয়ে যাচ্ছিলেন।]
ওসিরিস : এমন নিখুঁত সৌন্দর্য আমি আর দেখিনি। কি তনুশ্রী। ভালবাসার আমন্ত্রন চোখে মুখে। এলোমেলো চুলগুলোসব গুলিয়ে দিচ্ছে নন্দনের সুক্ষ্ম সমীকরণ। আহ্! তাই বলে এতটা সৌন্দর্য!!! যেই আমি সারাটা জীবন ধ্বংস করতে শিখেছি… তাও আবার তারই কাছে!! কুৎসিত না অনিন্দ্য সুন্দর হিসেব মেলাতে পারি নি। আমি কি করে বের হব এই রমনীর সম্মোহন থেকে….
[যান্ত্রিক রমনীটি এখন পুরোপুরি আসল নেফ্রর মত করেই আচরন করছে। একদম স্বাভাবিক। সে ওসিরিসের কন্ঠস্বর যেন শুনতেই পায়নি। কিন্তু ছায়া দেখে কৌতুহলী হন।]
নেফ্র ২ : কে কে ওখানে। অমন ভয়ংকর ভাবে দাড়িয়ে। নাম কি তোমার?
[ওসিরিসের অবয়ব ধীরে ধীরে তীব্র আলোতে স্পষ্ট হয়। থতমত খেয়ে নেফ্রতিতি চমকিত হয়। লজ্জিত হয়ে সে তাকায় ওসিরিসের দিকে। দু’জন দু’জনের চোখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে। সম্মোহিতের মতো চেহারা।]
নেফ্র ২ : মা করবেন প্রভুদেব। আমি নিতান্তই ক্ষুদ্র, অতি নগণ্য। কীট। আপনার সামান্য দাসী। আপনার পুত্রের ইচ্ছায় এখানে অবস্থান করছি।
ওসিরিস : ও, তাহলে তুমিই সে। তাহলে তুমি সত্যিই সুন্দর ।
[ওসিরিস প্রস্থান করে]

দৃশ্য -১১
[ওসিরিসের শয়ন শয্যা]
ওসিরিস [স্বগোতোক্তি] : হা…. তাহলে এতটাই সৌন্দর্র্য। মর্ত নারী তোমাতে কি মন্ত্র ছিল, আমি জানিনা। আমি আর জানতে চাইও না। আমার তোমাকে চাই ই চাই। দরকর হলে সব কিছু ধ্বংস করে দেব। নেফ্র তুমি আমার হবেই। হ্যাঁ, আমাকে তাই করতে হবে। যেমনটি ভেবেছিলাম। কিন্তু আমি যে তার খুব বেশি কাছা-কাছি যেতে পারছি না। ব্যাপার কিছু একটা আছে…

দৃশ্য -১২
[ভাগ্য দেবীর মন্দির। ওসিরিসের প্রবেশ। আসনে উপবিষ্ট হয়ে আছেন ভাগ্য দেবী।]
ভাগ্যদেবী : আসুন মহাদেব, আসুন। ভাগ্যদেবীর নিকট আপনাকে স্বাগতম। আপনার আগমনের সংবাদ পেয়েছিলাম। তা কি মনে করে আসা।
ওসিরিস : হে সর্বজান্তা দেবী, আপনি নিশ্চয় অবগত হয়েছেন যে কারণে আপনার নিকট আমি এসেছি তা কি? সমাধান বলে দিন কৃতার্থ হই।
ভাগ্যদেবী : আপনি পুরুষ হিসেবে তার সহিত মিলিত হতে পারবেন না। তার উপর রাকবজ আছে।
ওসিরিস : বিকল্প বাৎলে দিন। আমি অর্ধেয্য হয়ে আছি। আমাকে সাহায্য করুন।
ভাগ্যদেবী : আলবৎ, আলবৎ মৃত্যুদেব। উপায় একটা আছে। আপনি আমার ছদ্মবেশ নিয়ে তার সাথে মিলিত হতে পারেন। রা কবচকে ফাঁকি দেওয়ার এটাই একমাত্র পথ দেখতে পাচ্ছি।
ওসিরিস : সে তো চমৎকার। আপনাকে ধন্যবাদ দেবী। আপনি সত্যিই গুনবতী। প্রশংসাযোগ্য। ছেলেটাও বেশ কয়েকদিন দুর্গে নেই। কার্যোদ্ধার করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না আশা করি। সূর্যি দেবকে এবার হারতেই হল।
ভাগ্যদেবী : সফলতা কামনা করছি। বিদায়।
[ওসিরিসের প্রস্থান]

দৃশ্য -১৩
[নেফ্রতিতি একাকী শুয়ে আছে তার শয়ন কক্ষে
ভাগ্যদেবীর বেশে ওসিরিসের আগমন।]
ওসিরিস : নেফ্র! তোমাকে বেশ বিষন্ন মনে হচ্ছে। কারো অন- উপস্থিতি কি তোমাকে পীড়া দিচ্ছে ?
নেফ্র : খুব সম্ভবতঃ হ্যাঁ। তাকে আমি ভালবাসতে শুরু করেছি। অবশ্য ভালবাসা আমি জীবনে কখনো কম পাইনি। কিন্তু তবুও কেন যেন সেটিকেই আমি ঘৃণা করতাম।
ওসিরিস : এই আমিও কিন্তু তোমাকে কম ভালবাসি না। তোমাকে ভালোবেসে সবাই সব কিছু পেয়েছে, আর আমি কিছু পাব না ?
নেফ্র : দেবী, আপনাকে আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
ওসিরিস : বুঝতে পার না। দাঁড়াও তোমাকে বোঝাচ্ছি…
[ওসিরিস তীক্ষ্ণ করে তাকায়। চোখের দিকে গভীর করে তাকাতে বলে নেফ্রকে। নেফ্রর মাথা চক্কর মারে, টলতে শুরু করে। সে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ওসিরিসের বুকে। ছদ্মবেশি ভাগ্যদেবীর মুখে সফলতার হাসি। লাইট নিভে যেতে থাকবে। একটি নারী কন্ঠ বলতে থাকবে… “আমাকে ভালোবাসো, খুব করে ভালোবাসো প্রিয়। যতখুশী ভালোবাসো”। ওসিরিসের অট্রহাসি স্পষ্ঠতর হয়। তারপর সব চুপ। হটাৎ করেই ওসিরিসের চিৎকার শোনা যায়। কিছুণ পরে আলো জ্বেলে উঠে।]
ওসিরিস : না !!! এ রকম তো হতে পারে না। আমিই মৃত্যুদেবতা অথচ আমার অজান্তেই মৃত্যু।  এ..এ.. এত্ত্ব বড় বিশ্বাস ঘাতকতা। আমি কাউকে ছাড়ব না, কাউকে না।

[ওসিরিস ভাগ্যদেবীকে স্মরন করেন। ভাগ্যদেবীর আর্বিভাব ঘটে।]
ভাগ্যদেবী : আমায় স্মরণ করেছেন, মৃত্যুরাজ।
ওসিরিস : হ্যাঁ … এসব কি ঘটল, এসব কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে বোকা বানাতে চায় কার এত বড় স্পর্ধা?
ভাগ্যদেবী : নিয়তি। নিয়তির এত স্পর্ধা। নিয়তি কোন দেবতা মানে না। আপনাকে সে চেয়েছিল। এ আপনার বিধি লিখন মৃত্যুদেব। না আমি, না আপনি একে খন্ডাতে পারেন। আমরা সকলেই তার সামনে খুবই অসহায়। ওরা এভাবেই চেয়েছিল। আপনার পুত্র এবং নেফ্রতিতির জীবন পরষ্পরকে সুরতি রেখেছিল। মৃত্যু তাই তাদের একত্রেই হলো।
ওসিরিস : কি ? তবে কি আমার পুত্রও মৃত। হায়… এও কি সম্ভব। দেবরক্ত নিয়েও তাকে মরতে হল। আর আমি কিনা মৃত্যুর অধিপতি হয়ে আছি… হায়!!! … আমাকে থাকতে হচ্ছে নীরব। নিয়তি তুমি বড়ই স্বার্থপর। আমি কাউকে ছাড়ব না। ধ্বংস লীলায় মাতিয়ে দেব পৃথিবী। স্বর্গ, নরক আর সমস্ত পাতালের দেশ ।
ভাগ্যদেবী : আপনাকে ফাঁকি দিয়েছে। শাস্তি দিন। জনপদ মৃত্যুর রোষানলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিন। ধরিত্রীর যত ফসল কেড়ে নিন। শিা হোক দুধর্ষ সেই চারপোকাটার। ফারাও…
ওসিরিস : হ্যা… অবশ্যই তারা তাদের প্রাপ্য শাস্তি পাবে। আমাকে সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি দেবী। আপনি ইচ্ছে করলেই চলে যেতে পারেন। আমার কাজ শেষ।
[দেবী চলে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে ওসিরিস তাকে পুনরায় ডাক দেন। তিনি থামেন। ওসিরিস তার কাছে এগিয়ে যান।]
ওসিরিস : আপনি আমাকে আগেই জানালেন না কেন?
ভাগ্যদেবী : আপনি হচ্ছেন গিয়ে সবার বস। মানে আপনি হচ্ছেন গিয়ে মৃত্যু জরা আর অন্ধকারের মহান দেবতা। দেবাধিরাজ। আপনার ইচ্ছার একটা বিশেষ মূল্য আছে। আপনি যেহেতু তার সঙ্গে নিজের মিলন চেয়ে ছিলেন সেহেতু, আপনাকে আমি একমাত্র উপায়টি বাৎলে দিয়েছিলাম। পরিণতি জানালে আপনার মূল্যবান ইচ্ছাটি অপূর্ণই থেকে যেত। আমি ভাগ্যদেবী হিসেবে আপনার ইচ্ছাটাকে অপূর্ণ রাখিনি। কারণ, অন্ততঃ আপনার ইচ্ছাকে অপূর্ণ রাখার মতো ইচ্ছা আমার কখনোই থাকতে পারে না। বিদায় মৃত্যুদেব। ভালো থাকুন।
[ভাগ্যদেবীর প্রস্থান। নেফ্রতিতির লাশ কোলে বিক্ষুব্ধ ওসিরিস। চোখে মুখে ক্রোধের আগুন, দৃষ্টিতেই যেন দুর্ভিক্ষ… তার চোখ গুলো যেন জ্বলছে।]

দৃশ্য -১৪
[ফারাও’র সিংহাসন। দরবারে আমত্যবৃন্দ।]
জৌতিষী : সম্মানিত সভাবৃন্দ। সম্রাট এবং সম্রাজ্ঞীর যুগপৎ মৃত্যুতে আমরা যারপরনাই শোকাভূত। শোকে বিহবল। কিন্তু রাজ্যে উপযুক্ত রাজার অভাব। আপনারা এখন কাকে মনোনীত করতে চান?
পুরোহিত : দেবতাদের ইচ্ছা যেন কোন পুরোহিত তার আশীর্বাদ প্রাপ্ত লোক হিসেবে রাজ্যের মধ্যে শান্তি শৃংখলা ফিরিয়ে আনুক। কেননা তারাই সর্বজ্ঞানী।
জৌতিষী : চুপ কর, শয়তান। দেবতারা কি আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন নাকি আমি অজ্ঞ? অভিশাপ দিলে তোকে দিয়েছে। তুই লোভী, দুর হ তুই আমার চোখের সামনে থেকে …
[হঠাৎ করেই খাপ থেকে তলোয়ার বের করে ঘ্যাচ করে ঢুকিয়ে দেয় সে, পুরোহিতের  তলপেটে। আর্তনাদ করে উঠে পুরোহিত মেঝেতে পড়ে যায়।]
পুরোহিত : দুষ্ট লোক কোথাকার। নরকের শয়তান। তোর জন্যও অভিশাপ অপো করছে। আমি অপরাধ করে থাকলে, তুইও করেছিস। তুইও এর শাস্তি পাবি। কড়ায় গন্ডায়, সুদে আসলে পাবি… আমি তোকে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছি আ …আহ..
[উত্তেজিত সভাসঙ্গ বৃন্দের ছোটাছুটি, কানা-ঘুষা বাড়ে। জৌতিষী রাজ মুকুট মাথায় পরে, হাতে নেয় মতার প্রতীক– শাসন দন্ড।]
জৌতিষী : আপনারা সবাই শান্ত হোন। তা না হলে আপনাদের সকলের জন্য কঠিন দুর্ভাগ্য অপো করছে। দুর্ভোগ পোহানের চেয়ে তার সঙ্গে আপোষ করে নেয়াটা ভালো। সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমি বিশ্বাস করি যে, আপনারা প্রত্যেকেই বুদ্ধিমান। মাথামোটা ছাগল প্রজাতি নন। থামুন। স্থির হোন আর আমার রাজ্যভিষেক পালন করুন…সিপাহী…
[কয়েকজন সিপাহী উদ্ধত অস্ত্র হাতে এসে দাড়ায়]
জৌতিষী : যাও! শহরের রাস্তায় রাস্তায় আমার সিংহাসন আহরণ উপলে আনন্দ অনুষ্ঠানের আয়োজন কর। নর্তকী পাড়ার দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দাও। প্রজাদের সবাইকে ইচ্ছামতো আনন্দ করতে বলো। ফারাওন বংশের রক্ত আমাতেও বইছে। আমিই এর যোগ্য উত্তরসূরি।
[সকল সভাবৃন্দ ফ্যানিয়াসকে সেজদা করে অভিনন্দন এবং আনুগত্য জানায়। সবাই একত্রে বলে উঠে—“সম্রাটের মঙ্গল হোক”।]

দৃশ্য – ১৫
[ফারাওনের লুপ্ত মিশরীয় দরবার]
ফ্যানিয়াস : দূত, রাজ্যে যে ভাবে মঙ্গা আর অনাহার লেগেছে, তাতে এ দেশ ধূ ধূ মরুভূমিতে ধ্বংস স্তুপ হয়ে পড়ে থাকবে। সে দিন আর খুব বেশি দূরে নয়। কোথাও কোন শান্তি নেই।
দূত : আপনি বিচণ প্রভূ। তবুও বলছি রাজ্যে অবশিষ্ট আর তেমন কিছুই নেই। জরা আর কুঠি ছাড়া। ওসিরিসের প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ছি আমরা। অন্যদিকে ব্যবিলণীয় সৈন্যেরা এ দেশ আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ফ্যানিয়াস : কি বলছ তুমি, দূত। এ যে ভয়াবহ দুঃসংবাদ। আমাদের শক্তিশালী সৈন্য বাহিনী এখন যে আর আগের মত সামর্থ্যবান নেই। জরায় ধরেছে তাদের। এখন কি হবে? রাজ ভান্ডারও শূণ্য হয়ে পড়ে আছে প্রায়।
সেনাপতি : আমরা যুদ্ধ করব প্রভূ? জান প্রাণ দিয়ে লড়ব। হোক না জরা, হোক না কুঠি আর দুর্ভি, তাতে কি ?
ফ্যানিয়াস : তোমার দৃঢ়তা আমাকে প্রেরণা যোগাচ্ছে, সেনাপতি। আমি তোমার প্রশংসা করি। যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও।
সেনাপতি : জয়ের সম্ভবনা খুব একটা না থাকলেও আমাদের লড়াই অবশ্যই চলবে প্রভূ। আপনি সতর্ক থাকতে চেষ্ঠা করবেন সব সময়। আমি যাচ্ছি।

দৃশ্য -১৬
[ফ্যানিয়াসের শয়ন শয্যা। হঠাৎ করেই ওসিরিসের নিঃশব্দ আগমন।]
ওসিরিস : ফ্যনিয়াস! বড় বেশী খারাপ লোক তুমি। তুমি ঘুমিয়ে আছো আর আমি কিনা তোমাকে ঘুম পাড়াতে এসেছি। প্রতিহিংসার হস্তে ফুটছে বিষাক্ত লালা। ওঠ ফ্যানিয়াস। দেখ… তোমার শেষ পরিনিতি তোমার সন্মুখে স্বয়ং দাড়িয়ে। তাকাও …চোখ মেল এদিকে ফ্যানিয়াস।
ফ্যনিয়াস : কে, কে? নীরব ঘাতকের মতো এখানে কেন এসেছ ? চলে যাও, চলে যাও, চলে যাও বলছি। না হলে তোমার প্রাণ দন্ড দেব। চলে যাও বলছি।
ওসিরিস : যাবার জন্যেই তো এসেছি জৌতিষী। তবে তোমাকেও যে এবার যেতে হবে আমার সাথে। আমার সাথে তোমার হিসেব মেলাতে চলো…
[ওসিরিস এগিয়ে যেতে থাকে ভীত সন্তস্ত ফ্যানিয়াসের দিকে … ফ্যানিয়াস আর্ত চিৎকার করে … “না, না…আমাকে মেরো না, প্রভূ। আমাকে মেরো না”।]

[কোরাস [সুরে সুরে] :
সমস্ত দেশ পড়ে আছে শ্মসানে।
হাড় গুলো মিশে যায় নোনা বালিতে।
তপ্ত অভিশাপের নিঃশ্বাসে।]
[কোরাস ২ [কাব্যিক] :
ভরপুর প্রতিহিংসার কাছে;
সবাই সব থেকেও একদিন মরে নাই হয়ে যায়
মৃত্যু দেবের আর্শীবাদে;
শুধু মৃত্যু দেব বেঁচে থাকেন
অনন্তকাল একা
অতৃপ্তির ভিসুভিয়াসে…]                    [সমাপ্ত]

Comments
One Response to “রহমান জর্জির নাটক ওসিরিস”
  1. রহমান জর্জি says:

    আমার প্রথম এবং একমাত্র প্লে, হল লাইফ এ লেখা। আপনার সমীপে। যদিও ইউনিকোড প্রব আছে খানিকটা। আশা করি মারজনা করবেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: