নরেশ মণ্ডলের গল্প ভাঙ্গা ঢেউ

অনেকক্ষণ সুমন নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। বেলা পড়ে এসেছে। সূর্যের মধুর হাসি চলকে ওঠে জলে। ঘোলাটে জল, ওপাড় ঘেঁষে সিঁদুর ছড়ায়। সুমন বসে।  বাঁধানো পাড়। তলার দিকে বোল্ডারের গায়ে আছড়ে পরে জল। আড়াআড়ি পার হয় কয়কেটা নৌকা। মাথার উপর দিয়ে কয়েক ঝাঁক পাখি ঢুকে পড়ে পেছনের গ্রামে। সমস্ত ভালোলাগা আজ যনে তাকে পেয়ে বসেছে। পথরে ক্লান্তি জুড়িয়ে যায়। অনেকটা পথ পার হলে তবেই নদীটা। শুনেছে এখানে কোথাও আরো একটা নদী এসে মিশেছে আসার পথটা দারুণ লাগলো সুমনের । দু’ ধারে শিশু, বাবলা, ইউক্যালপিটাস। মধ্যিখান দিয়ে চওড়া পিচ ঢালা রাস্তা। এ রাস্তায় এক আধটা বাস চলে। ভ্যানেরই আধিপত্য। বাঁ দিকে ইটভাটার চিমনি মাথা তুলে। ওদিকে কিছুটা এগোলে ডায়মন্ডহারবার। ডানদিকে ফলতা ইন্ডাস্ট্রয়িাল কমপ্লক্সে। গড়ে উঠেছে বড়ো বড়ো বাড়ি, জলের ট্যাঙ্কও নজরে পড়ল। দু’পাশে গাছের সারি। মধ্যিখান দিয়ে চলে গেছে পাকা রাস্তা।

-আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এটাতো তোমায় আগেও বলেছি। এখন আবার এ নিয়ে কথা বলছো। এক ঝটকায় কথাগুলো বলে রুনা।

কিছউক্ষণ বাকরহিত হয়ে পড়ে সুমন। ভাবতে পারেনি রুনা এভাবে কথাগুলো বলবে। স্বরটাও বশে কর্কশ শোনায়। নিজেকে যথাসাধ্য সংযত করে, তুমি এতটা অবুঝ হচ্ছো কেন। একটু বুঝবার চেষ্টা করো। প্রথম প্রথম একটু আধটু অসুবিধা হবে। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। প্লিজ, রুনা তুমি একটু ভাবো।”

-এ নিয়ে আবার নতুন করে ভাবার কি আছে। আর এ নিয়ে তোমারইবা এতো মাথা ব্যথা কেন। আমাকে জড়ানোর কোন অর্থই হয় না। এ ব্যাপারে আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। আর এটাই আমার শেষ কথা।  

                                                       
কথাগুলো বলে রুনা দম নয়ে। একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এভাবে বলতে হয়তো চায়নি। কিন্তু বলাটা হয়ে গলে।

সুমন রুনার মুখের দিকে চায়। চোখ দুটো অসম্ভব শান্ত। কিছু আগেও সুমনের চোখে ছিল আগুন। কিন্তু কণ্ঠস্বর অনেকটা খাদে নামিয়ে এনে কথা বলে বলে। ভেতরের উত্তেজনা বুঝতে
দেয়নি একবারও। শুধু বলল, “ওদের পাশে দাঁড়ালে ভালো করতে। কিছু শিখতে পারতে। ওদের শেখানোর দায়িত্বটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই রুনা।”

-অমন মাষ্টারি ঢঙে কথা বোলো না।

-এটা আমাদরে লজ্জা। শিক্ষিতের অহঙ্কার সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে রুনা। নিজেকে এভাবে তুমি দূরে সরিয়ে রাখতে পার না। অন্ধকার। ভয়ঙ্কর এক অন্ধকারে আচ্ছন্ন সব। বস্তু থেকে আলো ঠিকরে এলে তবেই আমরা যেমন সেই বস্তুকে চোখে দেখি। জ্ঞান তেমনি আলোকচ্ছ্বটা যা আমাদরে চোখকে খুলে দেয় । প্রভেদ বুঝতে সাহায্য করে। জ্ঞানের ভাণ্ডারকে যত সমৃদ্ধ করা যায় ততই প্রসারতি হয় দৃষ্টি। এই অন্ধকারের পর্দাকে সরিয়ে ফেলার দায়িত্ব আমাদেরও।

রুনা কোন কথা বলে না। হাতের রুমালটা আঙুলে পেচায়। চোখ চলে যায় দূরে । যেখানে সর্যাস্তের অন্তিম লালিমা আন্দোলিত জলে। কখন যেন নদীটা রুনার বুকে তিরতির করে বয়। ফেলে আসা বইয়ের পাতা ভেসে ওঠে ছবির মতো। রৌদ্রোজ্জ্বল ঝকঝকে ছবি। আজও আওড়ে যেতে পার কত কবিতা। ফ্রক পরে বেণী দুলিয়ে আলপথে বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া। খুনসুটি করা। মুগ কড়াই তুলে খাওয়া। ক্রমে শরীরে উঠল শাড়ি। চৈতি হাওয়া একদিন জানান দিল রুনা আর ছোটো নেই। হঠাতই রুনা বড়ো হয়ে গেছে। উচ্ছ্বলতার মধ্যেও এক সীমাবদ্ধতা কাজ করে।এই বয়ে যাওয়া নদী এক অন্য মাত্রা আনে রুনার জীবনে। কলকল করে বয়ে যাওয়া, পাড়ে ছলাৎ ছলাৎ আছড়ে পড়া নদী। পাহাড়-পর্বত, চড়াই-উৎরাই পার হয়ে এক সময়ে গভীর সমুদ্রে এসে লীন হয়ে যায়। রুনাও লীন হয়ে যেতে চায় গভীর প্রত্যয়ে।     
                                                                  
-চলে যেতে হবে।

উঠে পড়ে সুমন। দূরে জ্বলে ওঠে আলো। আলো আঁধারির ঘরো টোপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে এক মানব মানবী। অদ্ভুত এক নৈ:শব্দতা চারপাশ ঘিরে।

কলকাতা থেকে অনেক দূরে গড়ে ওঠা এই আধা শহরে এসেছিল সুমন। এক অমোঘ টানে। ভালোলাগার মহিমাময় রূপ অন্বষেণে। এক উৎসবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছেলি এই টান। তাই ছুটে আসা।

আলোর রোশনাই গ্রামময়। রাত বাড়ে। বাজির শব্দ। উচ্ছ্বাস, হুল্লোড়। বলি হবে। বাজবে কাঁসর ঘণ্টা। কপালে রক্ত তিলক। শিক্ষিত-অশিক্ষিতের উন্মাদনা। জল ছপছপে শরীরে নারী-পুরুষের হত্যে দেওয়া, দণ্ডি কাটা। কাদায় কাদাময় শরীর। পিচ্ছিল চারধার। উপবাস। মানত। আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণরে অভিপ্রায়ে কৃচ্ছ্রসাধন। টিভির পর্দায় দেখো ডিস্কো, পপ। পোশাক-আশাকে
ফিল্মি স্টার। মেলাতে পারে না সুমন। এ যেন অনেকটা প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো।

আকাশশের তারাগুলো স্পষ্ট হতে থাকে। নদী থেকে ভেসে আসা ঠাণ্ডা বাতাস শরীরময় খেলা করে। সামনে রিক্সা স্ট্যান্ড। রিক্সা মানে ভ্যান রিক্সা। রুনা গুণ গুণ করে গাইতে থাকে কোনো এক গানের কলি।

চেনা অচেনার রহস্যময়তার মধ্যদিয়ে ভ্যান রিক্সার টিম টিম আলো ওদের নিয়ে অন্ধকারের বুক চিড়ে এগিয়ে চলে।

                                 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: