পরাগ রিছিল লিখেছেন বেসরকারি কবিতা পড়ে একটি বেসরকারি আলোচনা

মাঝে মাঝে আমরা আড্ডায় বসি। সবসময় যে সাহিত্য নিয়ে আড্ডা হয় তেমন নয়। যারা সাহিত্যপ্রেমী নয় তারাও আড্ডায় বসে। তেমনি এক আড্ডায় একদিন বললাম, ‘একটা বই নিয়া আইছি।’ একজন চটজলদি বইটা হাতে নিয়া বললো, ‘বইটার নামটাই তো আলাদা!’ আরেকজন বলতে লাগলো, ‘দেও আমি দেখি।’ তার আগে আমিও বইটা নেড়েচেড়ে দেখেছি মাত্র। নতুন বই হাতে আসার পর সবাই যেমনটি করে। কবিতা পড়েছি দু’তিনটা তার মধ্যে আদিবাসী বুড়ি, মইত্যা চোরা, বেসরকারি কবিতা। তখন বোধ করি কিছুটা অভিমানও জন্মেছিলো! আদিবাসীদের এতো এতো বিষয় থাকতে ‘বুড়ি’ নিয়ে লেখা! তাদের হাত থেকে ফিরিয়ে নেয়ার আগেই একজনের বইটি পড়া শেষ, যে সচরাচর কবিতা পড়ে না, মন্তব্য করলো ভালো লেগেছে। শুরুটা সবুজের দিকে তাকিয়ে থেকে, কারণ
যে শহরে, যে পাড়ায় থাকি-
সেখানে ঘাস নেই, বৃক্ষ নেই। শিরোনাম চক্ষুরোগে ভুগছি।
’হিরালাল’ ভালোলাগা কবিতাগুলোর মধ্যে একটি। মেথরের ছেলে বলে আমরা যারা হিরালালদের মেথর করেই রাখি! মেথর হিসেবে ভাবতেই অভ্যস্ত। মেধার স্ফুরণ ঘটালে ম্যানেজিং কমিটির বৈঠক ডেকে যাকে স্কুল ছাড়া করা হয়। মেথরের ছেলের আবার লেখাপড়া!
বেসরকারি কবিতায়-
শাশুড়ি পাতে হরিণের মাংস তুলে দিয়ে বলেন-
বাঘের মত খাও, বাঘ হও।
পুরানা আমলের বন্দুক কাঁধে হাওরে বিলে পাখি শিকার করে বলে
এলাকায় চাচার মর্যাদা বেড়েছে-
হিস্যা বেড়েছে, ফাও বেড়েছে।
‘পাতানো’ বর্তমান কালের এক দগদগে ঘা। খোঁড়া মানিকের স্বগতোক্তিতে কী উঁকি দেয় প্রেমিকের মুখ, বেদনা? ‘হরিনাচ’ আছে ভালোলাগা কবিতাগুলোর তালিকায়।
হিঁদুপাড়ার মেয়েরা বেজায় সুন্দরী।
ওরা গান করে, নৃত্য করে
আমাদের মুসলমান মেয়েগুলো
একেবারে বুদু- কিচ্ছু পারে না।
এমন ধারণা আছে প্রতি শহরের পাড়ায় পাড়ায়। আর, যদি শ্রীমতি নীরবতা রায়/ হঠাৎ সামনে এসে থমকে দাঁড়ায়।/ সে জন্যে যুবকেরা কালেকালে করে যায় কতো কিছু। ‘মফিজ বা মফিজা’ মজার কবিতা, পড়ে অনেকে হয়তো মুচকি হাসবেন।
মা, তোমরা যার সঙ্গে আমার বিয়ে পাকাপাকি করেছ
তাকে আমার পছন্দ নয়।
‘আত্মহত্যা’ কবিতাটি বেদনাচ্ছন্ন করে। পাই সময়ের প্রতিচ্ছবি।
উকিলের গাউনের মতো খণ্ড খণ্ড কালো মেঘ আর দৌড়ের উপর সময় যাওয়া পাঠকের জন্যে নতুন অভিজ্ঞতা। পৃথিবীতে যখন আমার কিছুই করার নেই তখন হতাশ মানুষের কাঁধে পড়ে বুঝি অভিনব দায়িত্ববোধ। সায়েন্স ফিকশনের মজাও পাবেন। কবিতায় রয়ে যায় আরও কি যেন…? ‘খাদের কিনারে’ একই সাথে বাস্তব ও সাংঘাতিক!
দেখি আদিবাসী এক বুড়ি
ঝর্ণা জলে শস্যবীজ ছড়ায়
সে বলে-
এভাবে পূর্বপুরুষগণ
পৃথিবীকে এনেছে
জুমচাষের আওতায়।
পড়ে পূর্বোক্ত অভিমান হাওয়ায় ভেসে যায়। বয়স্ক না হলে, অভিজ্ঞতায় সিঞ্চিত না হলে তো এই অনুভব সম্ভব নয়!
গন্ধ বিষয়ক-
শরণার্থী শিবির আর মহানগর ঢাকার
গন্ধ কিন্তু একই।
দিনলিপি ভরে উঠে… পাকা টসটসে ফল কিনে হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করে বিষ কিনছি না তো, আমরা বিষ খাচ্ছি না তো।
শান্ত, নিরীহ প্রাণীর মুখোশ খুব একটা চলে না।
সবাই হিংস্রতা দেখাতে চায়-
ভূমি দস্যুর পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে ধরিত্রীকে উদ্ধার করা হয়।
আমি দেখেছি ধরিত্রীর গায়ে কিছুই ছিল না-
একেবারে ঘাসহীন, বৃক্ষহীন।
আর পাহাড়গুলো ন্যাড়া,
নদ-নদী, খাল-বিল ভরাট।
শীতে কাঁপছিল সে।
মইত্যা চোরা সম্পর্কে কিছু বলবো না, ভাত আর মাছের ঝোল পেয়ে/ ভরপুর খেয়ে আরামসে ঘুমিয়ে/ পড়েছে, উনুনের পাশে মাটিতেই।
এখন তো ডাকাতির যুগ, পুকুর চুরির যুগ! ধরিত্রীকেও উদ্ধার করা হয়েছে ভূমি দস্যুর বাড়ি থেকে! ‘কুয়া’ পুরোটাই তুলে দেবার মতো কবিতা।
অভয় পৃথিবী নেই পুরোটা তুলে দিলাম।
ইংরেজরা একসময় ভারতীয়দের দাবিয়ে রেখেছে।
পাকিস্তানিরা একসময় বাঙালিদের দাবিয়ে রেখেছে।
এখন বাঙালিরা আদিবাসীদের দাবিয়ে রাখছে।

শেখ মুজিব বললেন, ‘তোরা সব বাঙালি হয়ে যা।’
মেজর জিয়া মনে করলেন- আদিবাসীরা উপমানুষ,
এদের প্রয়োজন নেই।

পৃথিবীর দেশে দেশে বিলুপ্ত-প্রায় প্রাণীর বংশ বৃদ্ধির
জন্য অভয়ারণ্য রয়েছে। কিন্তু হাজদা, মারমা,
চাকমা, হেমরমদের জন্য অভয় পৃথিবী নেই।
আমাদের গ্রামে মগড়া নদী, পইত্যা, দাইড়া বিল,/ জলভাঙা, তলা, কাটাহালি, হাওর আছে-/ কিন্তু মাছ শিকারে/ জেলেদের অধিকার নেই।
ছিনতাই-য়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো দ্রুতগামী গাড়িগুলোর সঙ্গে লোকটির পলায়ন নৈপুণ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়।

এনজিওদের নিয়ে নানা সময় নানা বিতর্ক উঠলেও বলা হয় এনজিওদের উদ্দেশ্য সমূহের অন্যতম হলো তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছে দেয়া।
মন্ত্রী-মিনিস্টার নয়, সংসদ সদস্যরা যে বিল উত্থাপন করেন তাকে বলা হয় বেসরকারি বিল।
কবি, যেসব বিষয় মানুষদের নিয়ে আপনি লিখেছেন, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের মতো একলা হয়েও আপনি যদি এইসব লেখেন- কথা দিলাম, ভোট আপনেরেই দিমু!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

  • কপিলেফ্ট ওয়েব জার্নাল : একটি বিকল্প লিটলম্যাগ Copyleft webjournal : an alternative littlemag

    কপিলেফ্ট। এখানকার যে কোনও লেখা যে কেউ অবাণিজ্যিক ও অলাভজনক উদ্দেশ্যে মূল লেখা ও লেখককে

    অবিকৃত রেখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পারবেন।

    Copyleft: Matters in this site is copyleft. Everybody can reprint or republish this without modifying author and writing and without the permission of author and publisher for only noncommercial purposes

%d bloggers like this: